ঢাকা

সাতক্ষীরা–৪ আসনে গাজী নজরুলের বিকল্প প্রার্থী নিয়ে তৎপর জামায়াত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সম্ভাব্য উপনির্বাচন সামনে রেখে আসনটিতে মাওলানা আবদুর রহমানকে ঘিরে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে দলটি। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আসনটি শূন্য ঘোষণা না করা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে না জামায়াত।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, পেশায় শিক্ষক মাওলানা আবদুর রহমান জামায়াতের শ্যামনগর উপজেলা শাখার আমির। সাতক্ষীরা-৪ আসন শূন্য হলে তাঁকে প্রার্থী করার বিষয়ে দলীয়ভাবে প্রাথমিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি না হলে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনেও তাঁকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রাখা হতে পারে।

আবদুর রহমানকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে—এমন আলোচনা সামনে আসার পর এলাকায় তাঁর গণসংযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমও বেড়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হলে দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করবে।

সম্ভাব্য প্রার্থী মাওলানা আবদুর রহমান বলেন, সংগঠন ও এলাকার মানুষের জন্য যিনি কল্যাণকর, দল তাঁকেই প্রার্থী করবে। যাঁকেই প্রার্থী করা হোক, সাতক্ষীরায় জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালী করতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

তবে দলীয় দায়িত্বশীল আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আবদুর রহমান ছাড়াও সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহীদুল ইসলাম (মুকুল) এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানির নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে।

গাজী নজরুলকে বহিষ্কার

গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে গাজী নজরুল জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম।

এরপর জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে। ২২ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

বহিষ্কারের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে পৃথক চিঠি দেওয়ার কথা জানায় জামায়াত। তবে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না এবং সাতক্ষীরা-৪ আসন শূন্য হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফলে আসনটিতে উপনির্বাচন হবে কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। এই অবস্থায় জামায়াত আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা না করলেও বিকল্প নেতৃত্ব প্রস্তুত রাখছে বলে দলীয় সূত্রের ভাষ্য।

স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা

এর মধ্যেই গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গত রোববার তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২১ সেপ্টেম্বর আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পরে মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড শেষ হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আদালতে অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

আসন ধরে রাখার প্রস্তুতি

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের পর থেকেই সাতক্ষীরা-৪ আসনে বিকল্প নেতৃত্বের বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়। দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের পর সেই তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

তবে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে এখনো আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়া—দুটি বিষয়কে জামায়াতও আলাদাভাবে দেখছে। ফলে ইসি আসনটি শূন্য ঘোষণা না করা পর্যন্ত দলটি আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা থেকে বিরত থাকতে চাইছে।

এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তির কারণে তাঁদের নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তাঁরা মনে করেন না। দল যাঁকেই প্রার্থী করুক, তাঁকে নির্বাচিত করতে তাঁরা কাজ করবেন—এমন আত্মবিশ্বাসের কথাও জানান তিনি।

সাতক্ষীরা-৪-এ জামায়াতের অবস্থান

সাতক্ষীরা জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে চারটি। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হন।

শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৪ আসনটিকে নিজেদের সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে জামায়াত। দলীয় নেতাদের দাবি, এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলটির একটি সুসংগঠিত ভিত্তি রয়েছে।

সর্বশেষ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের ৯৭টি কেন্দ্রে গাজী নজরুল ইসলাম ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছিলেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট।

এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালেও এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম।

তাঁকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাতক্ষীরা-৪ আসনে রাজনৈতিক সমীকরণও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হলে দলীয় প্রার্থী হিসেবে কাকে সামনে আনা হবে, সে বিষয়ে জামায়াত এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে আবদুর রহমানকে ঘিরে সাংগঠনিক তৎপরতা এবং আরও দুজনের নাম আলোচনায় থাকায় বোঝা যাচ্ছে, দলটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য একাধিক বিকল্প প্রস্তুত রাখছে।

এদিকে ইজ্জত উল্লাহর বক্তব্য, গাজী নজরুলের পরিবর্তে যাঁকেই দল প্রার্থী করুক, তাঁকে জয়ী করতে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগানো হবে। ফলে সাতক্ষীরা-৪ আসনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স