যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের অন্যতম পরিচিত বৃত্তি কর্মসূচি চিভনিং স্কলারশিপ। ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষে এ বৃত্তির জন্য আবেদন চলছে। বাংলাদেশসহ যোগ্য দেশগুলোর প্রার্থীদের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ৬ অক্টোবর ২০২৬, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা। আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী সময়সীমা ৬ অক্টোবর সকাল ১১টা ইউটিসি। নির্ধারিত সময়ের পর অনলাইন আবেদনব্যবস্থায় আর আবেদন করা যাবে না।
চিভনিং যুক্তরাজ্য সরকারের আন্তর্জাতিক বৃত্তি কর্মসূচি। ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত এ কর্মসূচির আওতায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন পেশাজীবীদের যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। বৃত্তিটি মূলত এক বছরের পূর্ণকালীন মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য।
বাংলাদেশের জন্যও চিভনিং একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৃত্তি। প্রতিবছর বিভিন্ন পেশার বাংলাদেশি পেশাজীবীরা এ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুযোগ পান। বৃত্তির পাশাপাশি চিভনিংয়ের আন্তর্জাতিক অ্যালামনাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগও থাকে।
চিভনিং স্কলারশিপ কী
চিভনিং মূলত যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ কর্মসূচি, যার লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের সম্ভাবনাময় পেশাজীবীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের নেতৃত্ব ও পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা।
এই বৃত্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের পূর্ণকালীন মাস্টার্স কোর্স করার সুযোগ পাওয়া যায়। তবে সব কোর্স চিভনিংয়ের জন্য যোগ্য নয়। কোর্সটি পূর্ণকালীন হতে হবে, সাধারণত শরৎকালীন সময়ে শুরু হতে হবে এবং মাস্টার্স ডিগ্রিতে সমাপ্ত হতে হবে। দূরশিক্ষণ, পার্টটাইম, জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ কোর্স চিভনিংয়ের আওতায় গ্রহণযোগ্য নয়।
কী কী সুবিধা পাওয়া যায়
চিভনিং একটি পূর্ণ অর্থায়নভিত্তিক বৃত্তি। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যয় বহনে সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি, যুক্তরাজ্যে যাতায়াতের বিমানভাড়া এবং জীবনযাপনের জন্য ভাতাসহ বৃত্তির নির্ধারিত অন্যান্য সুবিধা রয়েছে।
তবে কোন কোন খাতে কী পরিমাণ অর্থ বা সুবিধা দেওয়া হবে, তা প্রতিবছরের বৃত্তির নিয়ম ও প্রার্থীর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই আবেদনকারীদের সর্বশেষ তথ্য চিভনিংয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করা উচিত।
আবেদনের প্রধান যোগ্যতা
চিভনিংয়ের জন্য আবেদন করতে হলে কয়েকটি মৌলিক যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর—
চিভনিংয়ের জন্য যোগ্য কোনো দেশের নাগরিক হতে হবে;
স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে এবং তা যুক্তরাজ্যের মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতার সমমান হতে হবে;
স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর অন্তত দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যা মোট ২ হাজার ৮০০ ঘণ্টা কাজের সমান;
যুক্তরাজ্যের তিনটি যোগ্য মাস্টার্স কোর্সে আবেদন করতে হবে;
নির্বাচিত হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিঃশর্ত ভর্তির অফার (unconditional offer) অর্জন করতে হবে;
বৃত্তি শেষ হওয়ার পর নিজ দেশে অন্তত দুই বছর ফিরে থাকার অঙ্গীকার করতে হবে।
এখানে কাজের অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পূর্ণকালীন চাকরিই নয়, চিভনিংয়ের নিয়ম অনুযায়ী পার্টটাইম চাকরি, স্বেচ্ছাসেবী কাজ এবং বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক ইন্টার্নশিপও কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে এই অভিজ্ঞতা অবশ্যই স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর অর্জিত হতে হবে।
আইইএলটিএস ৬.৫ কি বাধ্যতামূলক?
চিভনিংয়ের ক্ষেত্রে আইইএলটিএসে ন্যূনতম ৬.৫ স্কোর বাধ্যতামূলক—এমন তথ্য অনেক জায়গায় প্রচলিত থাকলেও এটি বর্তমানে সঠিক নয়।
চিভনিং কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে নিজস্ব ইংরেজি ভাষার শর্ত তুলে দিয়েছে। তবে যে বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সে আবেদন করা হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আইইএলটিএস বা অন্য কোনো ইংরেজি ভাষা পরীক্ষার স্কোর চাইলে আবেদনকারীকে সেই শর্ত পূরণ করতে হবে।
কোন ধরনের প্রার্থীরা আবেদন করতে পারেন
চিভনিং কোনো নির্দিষ্ট পেশার জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন পেশা ও শিক্ষাগত পটভূমির প্রার্থীরা আবেদন করতে পারেন। তবে শুধু একাডেমিক ফল নয়, আবেদনকারীর নেতৃত্বের সম্ভাবনা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও আবেদন মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিভনিংয়ের আবেদনপত্রে নেতৃত্ব, সম্পর্ক তৈরি, নির্বাচিত কোর্স এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে চারটি প্রবন্ধভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। তাই আবেদনকারীর নিজের অভিজ্ঞতা, অর্জন, নেতৃত্বের উদাহরণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদনের পদ্ধতি
চিভনিং স্কলারশিপে আবেদন করতে হয় সম্পূর্ণ অনলাইনে। আবেদন শুরুর আগে প্রার্থীকে নিজের যোগ্যতা যাচাই করতে হবে এবং চিভনিংয়ের অনলাইন আবেদনব্যবস্থায় নিবন্ধন করতে হবে।
আবেদনের সময় ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত তথ্য, কাজের অভিজ্ঞতা, নির্বাচিত মাস্টার্স কোর্স এবং রেফারিদের তথ্য দিতে হয়। একজন আবেদনকারী যুক্তরাজ্যের তিনটি যোগ্য মাস্টার্স কোর্সকে তাঁর পছন্দ হিসেবে উল্লেখ করতে পারেন। আবেদন জমা দেওয়ার সময় দুটি রেফারির নাম, পদবি ও যোগাযোগের তথ্য দিতে হয়। পরে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচিত হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের রেফারেন্স লেটার জমা দিতে হবে।
আবেদনপত্রে নেতৃত্ব, নেটওয়ার্কিং, কোর্স নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে হয়। এসব উত্তর অবশ্যই ইংরেজিতে এবং নির্ধারিত শব্দসীমার মধ্যে দিতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিভনিংয়ের আবেদনপত্র তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রবন্ধ বা উত্তর তৈরি করা নিষিদ্ধ। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনকারীকে নিজের মৌলিক লেখা জমা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যের লেখা বা এআই দিয়ে তৈরি লেখা নিজের নামে জমা দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
আবেদন করার সময় যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে
চিভনিংয়ের আবেদন প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় শুধু যোগ্যতা পূরণ করলেই বৃত্তি নিশ্চিত হয় না। আবেদনপত্রে নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হয়।
বিশেষ করে—
নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা: কর্মক্ষেত্র, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
নেটওয়ার্কিং: বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সেই সম্পর্ক কীভাবে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগে কাজে এসেছে, তা উদাহরণসহ তুলে ধরা যায়।
ক্যারিয়ার পরিকল্পনা: যুক্তরাজ্যে কোন বিষয়ে পড়তে চান, কেন সেই বিষয়টি বেছে নিচ্ছেন এবং পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে কী ধরনের কাজ করতে চান—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
সামাজিক প্রভাব: নিজের কাজ বা উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজ, প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের জন্য কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন, সেটিও আবেদনে গুরুত্ব পেতে পারে।
আবেদনের পর কী হবে
চিভনিংয়ের ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষের আবেদন ৬ অক্টোবর ২০২৬-এ শেষ হবে। এরপর আবেদনগুলো যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই ও মূল্যায়ন করা হবে।
চিভনিংয়ের প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে আবেদন যাচাই শুরু হবে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বাধীন রিডিং কমিটি যোগ্য আবেদনগুলো মূল্যায়ন করবে। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সাক্ষাৎকারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে।
সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে। সফল প্রার্থীদের ফলাফল ২০২৭ সালের জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রকাশ করা হবে। সাক্ষাৎকারে সফল প্রার্থীদের ৮ জুলাই ২০২৭ বিকেল ৫টা (ব্রিটিশ সামার টাইম) পর্যন্ত অন্তত একটি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিঃশর্ত ভর্তির অফার জমা দিতে হবে। এরপর ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা শুরু করার কথা রয়েছে।
আবেদনের শেষ সময়
২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষের চিভনিং স্কলারশিপের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১টা ইউটিসি, যা বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা। নির্ধারিত সময়ের পর অনলাইন আবেদনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে।
তাই আগ্রহী প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে আবেদনপত্রের প্রয়োজনীয় তথ্য, তিনটি কোর্সের পছন্দ, কাজের অভিজ্ঞতার বিবরণ এবং প্রবন্ধগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিভনিং স্কলারশিপের বিস্তারিত তথ্য ও বাংলাদেশ থেকে আবেদনের পেজ:
চিভনিং বাংলাদেশ—অফিসিয়াল ওয়েবসাইট