ঢাকা

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, সন্দেহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। পছন্দের প্রার্থীদের পরীক্ষায় পাস করিয়ে নিয়োগের সুযোগ করে দিতে অধিদপ্তরের ভেতর থেকেই তাঁদের কাছে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে সেই প্রশ্নপত্র চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

২৪২টি পদে নিয়োগের জন্য গত শনিবার রাজধানীর ৯৮টি কেন্দ্রে বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর সামনে আসায় নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের আশঙ্কা আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, পরীক্ষা আয়োজনের দুই দিন আগে একটি প্রভাবশালী মহল থেকে কিছু চাকরিপ্রার্থীর তালিকা পাঠানোর কথা শোনা যায়। ওই প্রার্থীদের বাছাই ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের কথাও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হচ্ছে।

সূত্রগুলোর দাবি, পছন্দের প্রার্থীদের পরীক্ষায় পাস করানোর উদ্দেশ্যে পরীক্ষার আগের রাতে তাঁদের কারও কারও কাছে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জায়গায়। তবে কারা প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছেন, কারা তা পেয়েছেন এবং এ ঘটনায় অর্থ লেনদেন হয়েছিল কি না—এসব বিষয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তবে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দুই সরকারের আমলে নিয়োগপ্রক্রিয়া

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর। বিভিন্ন কারণে সেই সরকারের মেয়াদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২০ মে আগের বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়া চলার মধ্যেই গত ৫ জুলাই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। একই দিনে অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন।

এ সময় নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালন করা যুগ্ম সচিব ডি এম আতিকুর রহমানকেও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে বদলি করা হয়। তিনি অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় নিয়োগ কমিটির সভাপতির দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়।

প্রশ্ন তৈরি ও ছাপানোর দায়িত্বে ছিলেন পাঁচ সদস্য

উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি বিভাগীয় নিয়োগ কমিটি (ডিপিসি) গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি ডি এম আতিকুর রহমান। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আতিকুর রহমান।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) একজন সদস্য এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর মতিঝিলের জীবন বীমা টাওয়ারে অধিদপ্তরের ভাড়া করা কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ শুরু হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজ শুরু হয়ে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে।

প্রশ্নপত্র তৈরি, টাইপ করা ও ফটোকপি করার সময় নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের সঙ্গে প্রশ্নপত্র টাইপ ও ফটোকপির কাজে অধিদপ্তরের ১৮ থেকে ২০ জন কর্মচারীও যুক্ত ছিলেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রশ্নপত্র তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে ছাপানোর কাজ চলার বিষয়টি সামনে আসায় প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এত কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করার পরও কীভাবে তা পরীক্ষার আগেই ছড়িয়ে পড়ল, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা মিরাকল’

নিয়োগ কমিটির সভাপতি ডি এম আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি তাঁর কাছে ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক মনে হচ্ছে। এর আগে তিনি নির্বাচন কমিশনে দুটি নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরেও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি করেন তিনি।

নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করানোর জন্য কোনো প্রার্থীর তালিকা এসেছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডি এম আতিকুর রহমান বলেন, কেউ তাঁর কাছে এ ধরনের তদবির করেননি। তবে অনেকে তাঁর মুঠোফোনে প্রবেশপত্র পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেগুলো আমলে নেননি বলে জানান।

নিয়োগ কমিটির আরেক সদস্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তিনি বিব্রত। কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর ভাষ্য, শুক্রবার রাতে প্রশ্নপত্র তৈরির সময় কমিটির সদস্যরা একসঙ্গে ছিলেন এবং সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

তবে প্রশ্নপত্র তৈরির সময় কারা উপস্থিত ছিলেন, কারা ছাপানো ও ফটোকপির কাজে যুক্ত ছিলেন এবং প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ ও বিতরণের দায়িত্বে কারা ছিলেন—এসব তথ্য যাচাই ছাড়া ফাঁসের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন যুগ্ম সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন পরিচালক। অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন অধিশাখা) কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা তদন্ত করে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে কমিটি নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।

তদন্ত কমিটির সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার বিষয় রয়েছে। প্রশ্নপত্র তৈরির সময় থেকে শুরু করে ছাপানো, ফটোকপি, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠানোর প্রতিটি ধাপে কারা দায়িত্বে ছিলেন, তা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার সময়, উৎস এবং সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করাও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

তদন্ত কমিটিতে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা থাকায় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর আবদুল আউয়াল মজুমদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাইরে অন্য কারও পক্ষে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা অধিদপ্তরের ভেতর থেকেই ঘটেছে।

তদন্ত কমিটিতে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব হিসেবে রাখার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে মন্ত্রণালয় আন্তরিক হলে নিরপেক্ষ তদন্ত করা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের শনাক্ত করার বিষয়টি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

২৪২টি পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৯ হাজার আবেদনকারীর এই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং পরবর্তী পরীক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো জরুরি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স