তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন বিরোধী দলের নেতারা। একই দাবিতে সোমবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষ দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিল করেন। তবে তিলক মার্গ হয়ে এগিয়ে যাওয়া মিছিলটি ভগবান দাস রোডে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। ফলে মিছিলকারীরা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি।
মিছিলে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাও। বিক্ষোভকারীরা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও তাঁর পদত্যাগের দাবি জানান। এ সময় রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেই তাঁরা থেমে থাকবেন না; এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধেও আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
মিছিল শুরুর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে একটি অভিন্ন প্রতিবাদ চলছে। তিনি বলেন, ‘আলাদা কোনো প্রতিবাদ নেই। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর জন্য একটিই প্রতিবাদ চলছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী, অমিত শাহের পালা। আমরা থামব না।’
কংগ্রেসের এই নেতা অভিযোগ করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপে কাজ করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে বিরোধী নেতাদের আবেদন
এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে সোমবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন বিরোধী দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়া পরিচালনায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি এবং জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। একদিকে বিরোধী নেতারা আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন, অন্যদিকে দিল্লির রাস্তায় বিক্ষোভের মাধ্যমে তাঁদের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের পথে পুলিশের বাধা
রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে মিছিলটি তিলক মার্গ হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু ভগবান দাস রোডে পুলিশ মিছিলকারীদের আটকে দেয়। এতে বিক্ষোভকারীরা আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। মিছিল আটকে দেওয়া হলেও ভগবান দাস রোড ও আশপাশের এলাকায় বহু মানুষ অবস্থান করছিলেন।
বিক্ষোভের উদ্দেশ্য ছিল এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদ জানানো এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা। রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে এই আন্দোলনকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাঁর ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিক্ষোভের জন্য বিকল্প তিনটি স্থান নির্ধারণ
এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে আয়োজকদের যোগাযোগও চলছিল। গত রোববার ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা দিল্লি পুলিশের কাছে চিঠি দেন। চিঠিতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য নতুন একটি তারিখ নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে। স্থানগুলো হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড।
বিকল্প স্থান নির্ধারণের বিষয়টি বিক্ষোভ কর্মসূচির স্থান ও সময় নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আয়োজকদের আলোচনার প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে। তবে এসব স্থানে পরবর্তী কর্মসূচি কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
বিক্ষোভের আগে ছয়টি মেট্রোস্টেশনে বিধিনিষেধ
সোমবার কংগ্রেসের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লির ছয়টি মেট্রোস্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্টেশনগুলো হলো জনপথ, মান্ডি হাউস, বারাখাম্বা রোড, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক ও প্যাটেল চক।
দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) জানায়, এসব স্টেশনে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকলেও এক লাইন থেকে অন্য লাইনে ট্রেন পরিবর্তনের সুবিধা চালু ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছিল নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মেট্রোস্টেশনগুলোতে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্তে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে। তবে বিধিনিষেধ কতক্ষণ কার্যকর ছিল এবং পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
মেট্রো ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ
এর আগে রোববার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে দিল্লিতে মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা এবং ইন্টারনেট সংযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশ দেন। আদালত বলেন, কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা ভারতের সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদে জনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে যে বিধান রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বিক্ষোভের মতো পরিস্থিতিতে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার—দুই বিষয়ই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালতের নির্দেশে মেট্রো ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে জনশৃঙ্খলার স্বার্থে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধান মেনে চলার কথাও বলা হয়েছে।
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টে আবেদন, দিল্লিতে মিছিল এবং পুলিশের বাধা—সব মিলিয়ে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্টে বিরোধী নেতাদের আবেদনের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং আন্দোলনকারীরা পরবর্তী সময়ে কী কর্মসূচি ঘোষণা করেন, সেদিকে নজর থাকবে।