ঢাকা

সোহেল আফ্রিদির অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা, আটকের খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

তথ্যসূত্র: ডন

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) এই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে পুলিশ আটক করেছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। তবে তিনি কোথায় আছেন, তাঁকে আদৌ আটক করা হয়েছে কি না এবং আটক করা হয়ে থাকলে তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

গত রোববার খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। একই সঙ্গে প্রদেশটিতে গভর্নরের শাসন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সোহেল আফ্রিদির নিখোঁজ থাকার অভিযোগ প্রদেশটির রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পিটিআইয়ের অভিযোগ, জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির পাশাপাশি দলের শীর্ষ নেতাদের আটক করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকজনকে আটকের কথা স্বীকার করলেও তাঁদের মধ্যে সোহেল আফ্রিদি রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি।

লংমার্চের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর ‘আটকের’ অভিযোগ

কারাবন্দী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের নেতা-কর্মীরা গত ৪ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেন। গত শনিবার ছিল এই কর্মসূচির সপ্তম দিন। তবে তখনো লংমার্চটি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মধ্যেই অবস্থান করছিল।

এরই মধ্যে প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির ঘোষণা আসে। এর কয়েক ঘণ্টা পর খাইবার পাখতুনখাওয়ার তথ্যমন্ত্রী শফি জান অভিযোগ করেন, লংমার্চ চলাকালে পুলিশ সোহেল আফ্রিদিকে হেফাজতে নিয়েছে। শফি জান দাবি করেন, ওই সময় তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

তাঁর এই বক্তব্যের পর সোহেল আফ্রিদির অবস্থান জানতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন। তবে পুলিশের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরে পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়ার নেতা শহীদ খাট্টাক অভিযোগ করেন, সোহেল আফ্রিদির পাশাপাশি জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) জুনায়েদ আকবরসহ দলের আরও কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি নিজেই লংমার্চে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে সোহেল আফ্রিদি ও অন্য নেতাদের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

‘সোহেল আফ্রিদি কোথায়, আমরা জানি না’

সোহেল আফ্রিদির অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পিটিআইয়ের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা। দলের দাপ্তরিক এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিও ক্লিপে তিনি বলেন, ‘সোহেল আফ্রিদি কোথায় আছেন, তাঁকে কী অবস্থায় রাখা হয়েছে—আমরা কিছুই জানি না। জুনায়েদ আকবরেরও কোনো খোঁজ নেই।’

পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যের মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, সোহেল আফ্রিদি ও জুনায়েদ আকবরের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা ও আইনগত অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সোহেল আফ্রিদি রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি।

তালাল চৌধুরী বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে আগের অপরাধের কোনো রেকর্ড নেই এবং যাঁরা পুলিশের তালিকায় ‘ওয়ান্টেড’ নন, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে আটক ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তিনি দিয়েছেন কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

আটককে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলছে পিটিআই

সোহেল আফ্রিদি ও দলের অন্য নেতাদের আটকের অভিযোগের প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছে পিটিআই। দলটি এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং ‘প্রদেশের নির্বাচিত নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

পিটিআইয়ের মুখপাত্র শেখ ওয়াকাস আকরামের বক্তব্য অনুযায়ী, সোহেল আফ্রিদির কথিত আটকের ঘটনাকে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্ত থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, ঘটনাগুলো একই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ।

বিবৃতিতে শেখ ওয়াকাস আকরাম বলেন, ‘এই ঘটনাপ্রবাহ নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটানো এবং প্রদেশের সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার প্রতিফলন।’

তিনি সোহেল আফ্রিদিসহ আটক হওয়া বলে দাবি করা সব নেতার দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।

পিটিআইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিত করা এবং দলটির নেতাদের আটকের অভিযোগ—দুটি ঘটনাই নির্বাচিত নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসনে নতুন সংকট

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি এবং গভর্নরের শাসন চালুর উদ্যোগের ফলে প্রদেশটির প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এত দিন পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও নতুন সিদ্ধান্তের পর তাদের কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়েছে।

পিটিআই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছে, জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন প্রদেশটির সমস্যার সমাধান করবে না। দলটির অভিযোগ, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সোহেল আফ্রিদির অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়া এবং তাঁকে আটকের অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি নিশ্চয়তা না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

সোহেল আফ্রিদির অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা শুধু পিটিআইয়ের জন্য নয়, প্রদেশটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে লংমার্চ চলার সময় এই ঘটনা ঘটায় আন্দোলনের নেতৃত্ব ও পরবর্তী কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এখনো স্পষ্ট নয়, সোহেল আফ্রিদি কোথায়

এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখাওয়ার তথ্যমন্ত্রী শফি জান সোহেল আফ্রিদিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। পিটিআইয়ের নেতারাও তাঁকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করছেন। কিন্তু পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী কয়েকজনকে আটকের কথা জানালেও তাঁদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করেননি।

ফলে সোহেল আফ্রিদি সত্যিই আটক হয়েছেন কি না, হয়ে থাকলে কোথায় আছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

একই সঙ্গে জুনায়েদ আকবরসহ পিটিআইয়ের অন্য নেতাদের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে দলটি। আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের অবস্থান এবং মুক্তির বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর পরিস্থিতির স্পষ্টতা অনেকটাই নির্ভর করছে।

প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি, নির্বাচিত সরকারের কার্যক্রম স্থগিত এবং ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান লংমার্চ—সব মিলিয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। এর মধ্যে সোহেল আফ্রিদির অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কী তথ্য দেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স