রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ এনসিপি নেতার
সরকারের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কথা থাকলেও তাদের অন্তরে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে সরকার ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসা, দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পথে হাঁটছে। অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারও কার্যত দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে দলটির জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণবিষয়ক কমিটি।
রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে শুধু চেয়ার বদল হয়েছে
আলোচনা সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁরা রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন না হয়ে কেবল ক্ষমতার আসনে পরিবর্তন এসেছে। কেউ সংসদ সদস্য হয়েছেন, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন; অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি।
রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন গাড়িতে দক্ষ চালক বসালেও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের কাঠামো ঠিক না হলে সরকারও সফল হবে না।’
তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, শুধু নেতৃত্ব বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোয় কার্যকর সংস্কার না এলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না।
বিএনপির রাজনীতি ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ
হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকার বিএনপির নেতা-কর্মীরা বর্তমানে দলটির ভেতরে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছেন না। বিপরীতে, ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে যুক্ত হওয়া একটি অংশ ব্যবসায়িক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর বক্তব্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের বিষয়টি উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে তিনি সভায় কী কী নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন, তা বক্তব্যের বিবরণে উল্লেখ করা হয়নি।
সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রগতি নেই। বরং ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থ ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করেই বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পরে এসব মামলা অর্থ আদায় ও আপস-বাণিজ্যের উপলক্ষ হয়ে উঠছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এনসিপির এই নেতা বলেন, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিতে হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্তপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। নির্বিচারে মানুষকে মামলায় জড়ানো যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের আওতার বাইরে থেকে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনৈতিক নীতি ও সরকারি কাজে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কর্মসংস্থান, ডিলারশিপ ও সরকারি ঠিকাদারি কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তোলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর মতে, এসব ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও ন্যায্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলে জবাবদিহি দাবি করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সরকারের কোনো বক্তব্য সভার বিবরণে পাওয়া যায়নি।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা, প্রশ্ন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও
আলোচনা সভায় এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার এখন দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পায়।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে ঘিরে প্রচারিত একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, তাঁকে দুবাইয়ে আটক করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার কৃতিত্ব নিয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি ছাড়া পাওয়ার খবর আসার পর সরকার নীরব হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে বিএনপির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে আসে।
ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি
আলোচনা সভায় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে মাত্র ১৩টি মামলার বিচারকাজ চলছে। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
তাঁর অভিযোগ, বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে বিচারিক কার্যক্রমের গতি বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে ভুক্তভোগী পরিবার ও শহীদদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি সভায় গুরুত্ব পায়।
তদন্তে নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগ
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর বলেন, জুলাই গণহত্যার মামলাগুলোর তদন্তের দায়িত্বে থাকা কিছু পুলিশ সদস্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কয়েকটি মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি সম্পূর্ণ নির্দোষ ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তদন্ত ও বিচারকাজে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখানো প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে অপরাধীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
শহীদ পরিবারের সদস্যের অংশগ্রহণ
আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব আইনজীবী এরশাদুল বারী খন্দকার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ।
সভায় বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, তদন্তের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং সরকারের জবাবদিহির বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
বক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তাঁদের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তবে সভায় উত্থাপিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিচারসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকার, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।