আমির নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষের জেরে উত্তেজনা, নেতাদের একাংশের অভিযোগ এমদাদুল হকের অনুসারীদের বিরুদ্ধে
কুমিল্লা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কমিটি গঠন ও আমির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এ বিরোধের জেরে দলটির মহানগর কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কুমিল্লার মোগলটুলি এলাকার ফারুকিয়া হাউজিংয়ে অবস্থিত জামায়াতের মহানগর কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুমসহ মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতা ও রুকনদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
দলটির মহানগর পর্যায়ের কয়েকজন নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে আমির পদে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, নতুন কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচন এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা নিয়ে নেতাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ চলছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়। বুধবারের বৈঠক চলাকালে একদল নেতা-কর্মী কার্যালয়ের বাইরে জড়ো হয়ে হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে সেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে এবং কার্যালয় চত্বরে রাখা মাহবুবুর রহমানের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে কারা ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আমির নির্বাচন নিয়ে বিরোধ
কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের অন্তত তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।
এই নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহানগর জামায়াতের আমির পদে দীর্ঘদিন ধরে কাজী দ্বীন মোহাম্মদ দায়িত্ব পালন করায় দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে বর্তমান মহানগর কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
ওই নেতাদের দাবি, কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে বর্তমান আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক (মামুন) এবং আরেক নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিনকে পরবর্তী কমিটির নেতৃত্বে রাখা হবে না। তাঁদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি আমির নির্বাচন উপলক্ষে প্রস্তুত করা ভোটার তালিকায় বর্তমান আমির ও দুই নায়েবে আমিরের নাম রাখা হয়নি। তবে বর্তমান সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানসহ অন্য নেতাদের নাম তালিকায় রয়েছে। এ নিয়ে দলের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
মহানগর জামায়াতের ওই নেতাদের দাবি, মাহবুবুর রহমান আমির নির্বাচিত হতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে কয়েক দিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। এর মধ্যে জমি কেনাবেচাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বৈঠক চলাকালে হট্টগোল, পরে বিস্ফোরণ
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, রুকনদের ভোটে দলের আমির নির্বাচিত হন। কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার দায়িত্বে রয়েছেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার তিনি মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করেন। বৈঠকে আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। এ সময় কার্যালয়ের বাইরে একদল নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে হট্টগোল শুরু করেন। পরে কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর কার্যালয়ের সামনে ভাঙা গাড়ি, কাচের টুকরা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নেতা এ টি এম মাছুম নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
দলীয় নেতাদের একাংশ এ ঘটনার জন্য মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হকের অনুসারীদের দায়ী করেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এমদাদুল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বুধবারের বৈঠক ও কর্মসূচিতে মহানগর জামায়াতের অন্য নেতারা উপস্থিত থাকলেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় ঘটনাটিতে তাঁর বা তাঁর অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
দীর্ঘদিন একই নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি আলোচনায়
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নেতৃত্ব নিয়ে বর্তমান বিরোধের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তির আমির পদে থাকার বিষয়টিও রয়েছে।
সূত্রের দাবি, কাজী দ্বীন মোহাম্মদ ১৯৯৮ সাল থেকে কুমিল্লা শহর জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর তিনি মহানগর জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব নেন। ফলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৮ বছর ধরে তিনি শহর ও মহানগর জামায়াতের নেতৃত্বে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একই নেতৃত্ব বহাল থাকায় অন্য নেতাদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ সীমিত হয়েছে বলে দলের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। নতুন কমিটি গঠন ও আমির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই অসন্তোষ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বুধবারের ঘটনাকে ওই অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন দলটির কয়েকজন নেতা।
তবে দীর্ঘদিন একই নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি নিয়ে দলের সব পক্ষের অবস্থান এক কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে মহানগর জামায়াতের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার বিষয়ে বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপের জন্য আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কেউ আহত হয়েছেন কি না, কিংবা এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাতে মহানগর জামায়াতের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য
ঘটনার পর বক্তব্য জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক, সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান সোহেলসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁদের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে গণমাধ্যমে মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাঠানো হয়। মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের বরাতে পাঠানো ওই বক্তব্যে বলা হয়, কুমিল্লা মহানগরীর সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে, যা তাঁদের নজরে এসেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বুধবার রাত সাতটার দিকে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি সভা চলছিল। এ সময় কিছু যুবক কর্মসূচিতে ঢুকে হইচই শুরু করেন। পরে তাঁরা চিৎকার করতে করতে চলে যাওয়ার সময় একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
তবে বিবৃতিতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা, কমিটি গঠন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তদন্তের অপেক্ষায় ঘটনার কারণ ও দায়ীদের পরিচয়
কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কার্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা দলটির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে বিরোধকে সামনে নিয়ে এসেছে। দলীয় নেতাদের একাংশের অভিযোগ, নতুন কমিটির নেতৃত্ব ও ভোটার তালিকা নিয়ে অসন্তোষ থেকেই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে মহানগর জামায়াতের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ঘটনাটিকে সভা চলাকালে কিছু যুবকের হট্টগোল ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ, ককটেল বিস্ফোরণের সঙ্গে কারা জড়িত এবং গাড়ি ভাঙচুরের পেছনে কারা ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে দলীয় বিরোধের এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত কীভাবে তদন্ত ও সাংগঠনিক পর্যায়ে মোকাবিলা করা হয়, তা এখন দেখার বিষয়।