স্যাটেলাইট চিত্রে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণের ইঙ্গিত, বলছেন মার্কিন গবেষকেরা; সম্ভাব্য লক্ষ্য দূরপাল্লার ও বেশি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি
সৌদি আরব নিজেদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষকের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেশটির আল-দাওয়াদিমি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রে সম্প্রসারণের চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের মূল্যায়ন, নতুন স্থাপনাগুলো আরও বড় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে, যেগুলো বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারবে অথবা আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
সৌদি আরবের এই সম্ভাব্য উদ্যোগের পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ থাকতে পারে। এর মাধ্যমে ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় দেশটির সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রস্তাবিত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়েও ওয়াশিংটনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি ভবিষ্যতে কীভাবে পরিচালিত হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকাতে কী ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা থাকবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ, সামরিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনার নির্মাণকাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে নতুন স্থাপনাগুলো ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য নির্মিত হচ্ছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
স্যাটেলাইট চিত্রে উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণের ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরবের আল-দাওয়াদিমি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রের ছবি তুলেছে। কেন্দ্রটি রাজধানী রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক নির্দলীয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) দুই গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডয়েটসম্যান এসব ছবি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কেন্দ্রটিতে নতুন কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ভবন বিশেষভাবে তাঁদের নজর কেড়েছে। তাঁদের ধারণা, সেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গর্ত বা বিশেষ কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে।
কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর তৈরির সময় নির্দিষ্ট উপাদান মিশিয়ে জ্বালানির মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর তা মোটরের খোলের মধ্যে ঢেলে শক্ত হতে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত স্থাপনার আকার ও কাঠামো ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নতুন ভবনটির দুই পাশে শক্তিশালী দেয়াল রয়েছে। তাঁদের ধারণা, ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি তৈরির সময় দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ ঘটলে তার ধাক্কা নিয়ন্ত্রণ করা এবং আশপাশের স্থাপনা রক্ষা করাই এসব দেয়ালের উদ্দেশ্য হতে পারে।
ভবনটি আগে থেকে থাকা একই ধরনের একটি স্থাপনার তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ বড় বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রটিতে আরও একটি নতুন ভবন দেখা গেছে। সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান অথবা তৈরি করা ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণ করা হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে লেয়ার ও ডয়েটসম্যান তাঁদের মূল্যায়নে লিখেছেন, আল-দাওয়াদিমি কেন্দ্রের অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁদের মতে, এর সম্ভাব্য উদ্দেশ্য আরও বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা।
তবে নতুন ভবনগুলোর প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে রয়টার্স সৌদি আরবের দূতাবাস ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা জবাব দেয়নি।
কেন কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ
সামরিক বাহিনীগুলোর কাছে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে আগে থেকেই জ্বালানি ভরে রাখা যায়। ফলে উৎক্ষেপণের আগে জ্বালানি ভরার জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না এবং নির্দেশ পাওয়ার পর তুলনামূলক দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব হয়।
অন্যদিকে, তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে অনেক সময় উৎক্ষেপণের আগে জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হয়। এতে প্রস্তুতির সময় বাড়তে পারে এবং উৎক্ষেপণের আগে ক্ষেপণাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা বেশি সময়ের জন্য ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে।
এ কারণে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পেতে পারে। তবে শুধু উৎপাদনকেন্দ্রের আকার দেখে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত পাল্লা, বহনক্ষমতা কিংবা উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এফপিআরআইয়ের গবেষকদের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হয়েছেন লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) বিশেষজ্ঞ সাশা ব্রুখম্যান। তাঁর পাশাপাশি প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনএর বিশ্লেষক ডেকার ইভলেথ এবং প্রতিরক্ষাবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনসের বিশেষজ্ঞরাও স্যাটেলাইট চিত্র ও স্থাপনাগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার পর্যালোচনা করেছেন।
তাঁদের মূল্যায়নে, নতুন ভবনগুলো সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে আরও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রস্তুতিও এর উদ্দেশ্য হতে পারে।
চীনা প্রযুক্তির সঙ্গে মিল খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তার সম্ভাবনাও সামনে এনেছেন। তাঁদের মতে, সৌদি আরবের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন এবং আল-দাওয়াদিমি উৎপাদনকেন্দ্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামোর মিল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ১৯৯১ সালের একটি অবমুক্ত মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে চীনের কাছ থেকে গোপনে প্রায় ৪০টি ডিএফ-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল সৌদি আরব। এগুলো ছিল তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৪ সালের এপ্রিলে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো এ ধরনের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়। ওই কুচকাওয়াজের ভিডিও ও ছবিও পরে ইউটিউবে প্রকাশিত হয়েছিল।
এফপিআরআইয়ের গবেষকেরা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে ইয়েমেনে সৌদি আরবের ছোড়া চীনের তৈরি ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করার দাবি করেছেন। তবে এ শনাক্তকরণের বিস্তারিত প্রমাণ ও স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তৃত তথ্য দেওয়া হয়নি।
স্যাম লেয়ারের ধারণা, সৌদি আরব বর্তমানে কঠিন জ্বালানিচালিত ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে থাকতে পারে। তাঁর মতে, আল-দাওয়াদিমি কেন্দ্র সম্প্রসারণের একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হলো ডিএফ-২১ বা এ ধরনের আরও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা।
তবে এসবই গবেষকদের মূল্যায়ন ও অনুমান। নতুন স্থাপনাগুলোতে নির্দিষ্ট কোন মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে। ফলে সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনে চীনের সহায়তা নিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে রয়টার্স চীনের দূতাবাস ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাইলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি। সিআইএ মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। হোয়াইট হাউসও রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ভারসাম্য বদলাতে পারে
সৌদি আরব যদি আরও দূরপাল্লার ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক বিকল্প বাড়তে পারে বলে মনে করেন আইআইএসএসের গবেষক সাশা ব্রুখম্যান।
তাঁর মতে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে সৌদি আরবকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধবিমান পাঠানোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে না। বরং দূর থেকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
ব্রুখম্যান বলেন, ‘তেহরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো কিছুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার সক্ষমতা আপনার থাকতে চাইবে। বিশেষ করে তেহরানের আকাশে এফ-১৫ বিমান পাঠানোর মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে।’
এ প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি জেডিএএম নামের উপগ্রহ-নির্দেশিত বোমার কথাও উল্লেখ করেন। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। তবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে দেশটি সামরিক অভিযানে যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
ব্রুখম্যানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-উদ্বেগ। সৌদি আরব আরও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারলে দুই দেশের সক্ষমতার ব্যবধান কিছুটা কমতে পারে।
রয়টার্সের অনুরোধে এফপিআরআইয়ের গবেষকদের মূল্যায়ন পর্যালোচনা করে ব্রুখম্যানও আল-দাওয়াদিমি কেন্দ্রের সম্প্রসারণের সঙ্গে আরও শক্তিশালী কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য পরিকল্পনার সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন।
তবে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়লেই দুই দেশের সামরিক ভারসাম্য কতটা বদলে যাবে, তা নির্ভর করবে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত পাল্লা, নির্ভুলতা, উৎপাদনের পরিমাণ, প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে পারে অস্ত্র প্রতিযোগিতা
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণের বিষয়টি শুধু রিয়াদ ও তেহরানের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে।
সিএনএর বিশ্লেষক ডেকার ইভলেথও আল-দাওয়াদিমি কেন্দ্রের নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করছেন। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার নির্মাণ ও সম্প্রসারণের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করেন তিনি। এফপিআরআইয়ের গবেষকদের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হয়ে ইভলেথ বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো সামরিক আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই একই ঘটনা ঘটছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ঠিক একই ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। তুরস্কেও তা-ই হচ্ছে। এখন সবাই এটি করছে।’
অঞ্চলটির দেশগুলো ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ালে এক দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অন্য দেশকেও পাল্টা প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করতে পারে। এতে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও বহনক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতাও বাড়বে।
তবে সৌদি আরবের নতুন স্থাপনাগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিশ্চিত না হওয়ায় দেশটির সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাব্য উদ্যোগের রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়তে পারে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে রিয়াদের প্রস্তাবিত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বিরোধিতা আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সৌদি আরবকে সহায়তা করার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। সৌদি আরবের জন্য বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হলেও চুক্তির শর্ত ও সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক রয়েছে।
চুক্তির বিরোধীদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তির সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
তবে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছে। বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি এক বিষয় নয়। কোনো দেশের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণের তথ্যও নিজে থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার প্রমাণ নয়।
তবু সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা একই সময়ে এগোলে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তারসংক্রান্ত প্রশ্ন আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
নির্মাণকাজ শুরু ২০২৫ সালের এপ্রিলে
এফপিআরআইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, আল-দাওয়াদিমি উৎপাদনকেন্দ্রের সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। প্রথম পর্যায়ে জমি পরিষ্কার করা হয় এবং সম্ভাব্য সংরক্ষণাগার নির্মাণের জন্য খননকাজ শুরু হয়।
একই মাসের শেষ দিকে অথবা মে মাসের শুরুতে এমন একটি ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি তৈরির গর্ত থাকতে পারে বলে গবেষকেরা ধারণা করছেন।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বরের স্যাটেলাইট ছবিতে ভবনটির ভেতরে দুটি গভীর গর্ত দেখা যায়। সে সময় ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়নি বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ছবিতেও ছাদের কিছু অংশ অসম্পূর্ণ ছিল। তবে ভবনটির দুই পাশে শক্তিশালী দেয়াল দেখা যায়। গবেষকদের ধারণা, দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণের চাপ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে এবং পাশের স্থাপনাগুলোকে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এসব দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।
এফপিআরআইয়ের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রের স্যাটেলাইট ছবিতেও একই ধরনের দেয়াল দেখা যায়। আল-দাওয়াদিমির নতুন ভবনটিতে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর তৈরির কাজ হতে পারে—দেয়ালগুলোর উপস্থিতি তাঁদের এ ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভবনগুলোর ছাদ নির্মাণের কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি তৈরির যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ কেন্দ্রটিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে তাঁরা ধারণা করছেন।
এটি গবেষকদের অনুমান; উৎপাদন শুরুর সময় কিংবা সেখানে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হবে, সে বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকৃত লক্ষ্য এখনো অনিশ্চিত
স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন ভবন, গভীর গর্ত এবং বিস্ফোরণ প্রতিরোধী দেয়ালের উপস্থিতি সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। একাধিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষকও মনে করছেন, এই সম্প্রসারণ আরও শক্তিশালী বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি হতে পারে।
তবে স্যাটেলাইট চিত্র থেকে স্থাপনার সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও উৎপাদনকেন্দ্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য, উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন কিংবা ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায় না। এ বিষয়ে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের এই সম্ভাব্য উদ্যোগের তাৎপর্য তাই কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—নতুন স্থাপনাগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হবে, কোন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে, উৎপাদন কতটা বাড়বে এবং দেশটির সামরিক কৌশলে সেগুলো কী ভূমিকা রাখবে।
যদি সৌদি আরব সত্যিই আরও দূরপাল্লার ও বেশি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দিকে এগোয়, তাহলে ইরানের সঙ্গে সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার বিকল্প বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে বিতর্কও আরও জটিল হতে পারে।
এ মুহূর্তে স্যাটেলাইট চিত্র ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। তবে দেশটির প্রকৃত পরিকল্পনা এবং এর কৌশলগত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।