সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা; রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার গঠনের পক্ষে মত বিশেষজ্ঞদের
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন একটি ধারণা পেয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। সংসদে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার পাশাপাশি সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে অন্য উপদেষ্টাদেরও উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা যেতে পারে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপরেখা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
শনিবার (২৫ অক্টোবর) সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতবিনিময় সভায় এসব প্রস্তাব উঠে আসে। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া বৈঠকে দুপুরে এক ঘণ্টার বিরতি দেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বৈঠক শেষ হয়। এতে মোট ৪৪ জন অংশ নেন।
বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি নতুন ধারণা পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। আরও প্রস্তাব এলে সেগুলোও কমিটির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তার মেয়াদ যেন নিম্নকক্ষের মেয়াদের সঙ্গে একসঙ্গে শেষ না হয়, সে ধরনের একটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা বিবেচনায় এসেছে।
প্রস্তাবটির একটি অংশে বলা হয়েছে, উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করা হলে তাঁকে উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। সেই স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার পাশাপাশি অন্য উপদেষ্টাদেরও দুই পক্ষের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা যেতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের মতামত এসেছে এবং বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সবাইকে লিখিতভাবে নিজেদের মতামত জমা দিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কমিটি সেসব মতামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা মত দিয়েছেন বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। কমিটি চায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা লিখিত প্রস্তাব দিলে সেগুলো পর্যালোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণ করা হোক।
সংবিধান সংশোধনে একাধিক প্রস্তাব
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পাশাপাশি সংবিধানের বিভিন্ন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানো।
সংসদের দুই কক্ষের মেয়াদ নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করা যেতে পারে। উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে দেশের ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও এসেছে।
এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের মতো দেশে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া কেউ কেউ। তাঁদের কেউ কেউ উচ্চকক্ষের পরিবর্তে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সংসদীয় কমিটির কাঠামো ও কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়েও মতামত এসেছে। সরকারি হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত কমিটির বাইরে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
উচ্চ আদালতের রায় ও সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের ভূমিকা নিয়েও বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সরাসরি সংবিধান সংশোধিত হয়ে যায় কি না, সে প্রশ্ন বৈঠকে আলোচনায় ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি মত দিয়েছেন, উচ্চ আদালতের কোনো রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হলে সংসদের মাধ্যমে সংশোধনী আকারে সেই পরিবর্তন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সংবিধান সংশোধনে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের গঠন ও কর্মপরিধি নির্ধারণ এবং সেগুলো যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য নতুন কোনো কাঠামো তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘স্ট্যাচুটরি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’ নামে একটি নতুন সংজ্ঞা প্রণয়নের চিন্তাও এসেছে বলে জানান তিনি।
পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আলোচনায়
সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, এ বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে আগের সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনো বিশেষ কমিটির আলোচনায় রয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো নির্ধারণের বিষয়গুলোও কমিটির আলোচনার অংশ বলে জানান তিনি।
‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা যেন মাথায় থাকে’
বৈঠকে অংশ নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় অনেক প্রত্যাশা নিয়ে বৈঠকে গেলেও পরে হতাশ ও প্রতারিত হয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আসিফ নজরুল বলেন, এবার তিনি ভালো পরিবর্তনের আশা করছেন। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা যেন সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় গুরুত্ব পায়, সে বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তিনি নিজেসহ আরও কয়েকজন বিরোধী দলকে আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলেছেন। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে, নাকি সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমেই পরিবর্তন আনা হবে—এমন প্রশ্নে আসিফ নজরুল বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধের অংশ। তিনি এ বিতর্কে যেতে চান না। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, সংবিধানে যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনই একধরনের সংস্কার। তাঁর মতে, পরিবর্তনের নাম বা প্রক্রিয়ার চেয়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি
সংবিধান সংশোধন নিয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর বিএনপির যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বিরোধী দলকে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিরোধী দল যদি কোনো কোনো বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট শিথিল করার প্রস্তাব দেয়, তাহলে তাদের কমিটির বৈঠকে এসে তা জানাতে হবে। এরপর কমিটি বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
অর্থাৎ, বিএনপির ভিন্নমতসংক্রান্ত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করছে আলোচনার পরবর্তী ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর প্রস্তাবের ওপর।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী ও সুব্রত চৌধুরী।
বিশেষ কমিটির সদস্যদের মধ্যে বৈঠকে অংশ নেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন ও সাকিলা ফারজানা।
বৈঠকে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত মতামত সংগ্রহ ও পর্যালোচনার পর কমিটি তার প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি, সংসদের দুই কক্ষের কাঠামো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী সুপারিশ আসে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর।