ঢাকা

‘এভাবে হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, ফিরতে হতো রাজপথে’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে লাখো মানুষের বিক্ষোভ; মোতায়েন ৭০ হাজার পুলিশ, প্যারিস ও মার্সেইয়ে সংঘর্ষ

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সরকারের নীতির প্রতিবাদে আবারও রাজপথে নেমেছেন ফ্রান্সের লাখো মানুষ। গত সপ্তাহে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে কাঁদানে গ্যাসের মুখে পড়ার পরও শনিবারের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন এমিলি গ্রঁদ্রি নামের এক ফরাসি মা। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মিছিলে অংশ নেওয়া এই নারী বলেছেন, হতাশ হয়ে আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই; নিজেদের অধিকার ও দাবির পক্ষে দাঁড়াতে রাজপথে ফিরতেই হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে এমিলি গ্রঁদ্রি বলেন, ‘এভাবে হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না, আমাদেরকে রাজপথে ফিরতেই হতো।’

শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। তাঁদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকার বিষয়টিও বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের কাছে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা। তাঁদের অনেকের মতে, প্রতিবাদের সময় সংঘর্ষ ও পুলিশের বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

জরাজীর্ণ স্কুল, শিক্ষকসংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

এমিলি গ্রঁদ্রির ১৫ বছর বয়সী ছেলে অ্যারনও মিছিলে অংশ নেয়। নিজের স্কুলের অবস্থা তুলে ধরে সে জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন জরাজীর্ণ এবং শিক্ষকসংকট তীব্র। তার অভিযোগ, এসব সমস্যা সমাধানে সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।

অ্যারন বলে, ‘আমাদের স্কুল ভবন জরাজীর্ণ। শিক্ষকেরও তীব্র সংকট চলছে। অথচ সরকার এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন।’

মিছিলে পুলিশের বাধা দেওয়ার বিষয়টিকেও সমালোচনা করেছে কিশোরটি। তার দৃষ্টিতে, নিজেদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামা মানুষের প্রতিবাদ দমনে পুলিশের বাধা দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।

শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ বিক্ষোভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ তাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

এমিলি গ্রঁদ্রির মতো অনেক অভিভাবক সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের কাছে বিক্ষোভ কেবল বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিবাদ নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উন্নত জীবন ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিও।

ভাঙচুরের ক্ষতি নিয়ে আলোচনা, দরিদ্র মানুষের দুর্দশা নিয়ে প্রশ্ন

২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ক্লারা লেব্বাদি রয়টার্সকে বলেন, বিক্ষোভে দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনায় মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সারা বছর ধরে যাঁরা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছেন, তাঁদের দুর্দশা নিয়ে একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।

ক্লারা বলেন, মানুষ ভাঙচুর হওয়া দোকানের জন্য কান্নাকাটি করছে। অথচ যাঁরা সারা বছর ধরে আরও গরিব হচ্ছেন, তাঁদের জন্য কারও মায়া নেই।

বিক্ষোভকারীদের একটি প্ল্যাকার্ডেও এ ধরনের ক্ষোভ ফুটে ওঠে। তাতে লেখা ছিল, ‘জিনিসপত্র ভাঙলে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষকে যাঁরা আঘাত করেন, তাঁদের কী হবে?’

এই স্লোগানের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা সম্পত্তির ক্ষতি ও মানুষের ওপর নিপীড়নের ঘটনায় জবাবদিহির প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্যে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।

তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যের বাইরে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

ভয় থাকলেও অধিকার রক্ষার আহ্বান

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ফরাসি শিক্ষার্থী লাওয়ের মতে, ভয় পেয়ে আন্দোলন বন্ধ করে দিলে দাবি আদায় করা সম্ভব হবে না। তাঁর বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার যে মনোভাব রয়েছে, তা প্রতিফলিত হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে যোগাযোগকর্মী নাদেজ বলেন, ‘সবাই বেশ ভয় পাচ্ছে। তবু নিজেদের অধিকারটুকু টিকিয়ে রাখতে হবে।’

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের মধ্যেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বা অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। তারপরও নিজেদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলনে থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন তাঁরা।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের অভিজ্ঞতায় ভয় ও দৃঢ়তা পাশাপাশি রয়েছে। একদিকে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস কিংবা পুলিশের বাধার আশঙ্কা; অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। এসব কারণেই অনেক বিক্ষোভকারী আন্দোলন থেকে সরে না এসে আবারও রাস্তায় ফিরেছেন।

মেয়েকে নিয়ে মিছিলে শিক্ষক, নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি

বিক্ষোভে শুধু তরুণ ও শিক্ষার্থীরাই নন, অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ। বার্তা সংস্থা এপিকে শিক্ষক বেনেদিক্ত পিত্তিওঁ জানান, তরুণদের দাবিদাওয়া সরকার গুরুত্ব দিয়ে শুনছে না বলেই তিনি নিজের ১৬ বছর বয়সী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মিছিলে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর অংশগ্রহণে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তরুণদের দাবি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবারগুলোর মধ্যেও তা উদ্বেগ তৈরি করছে।

অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকিং পরামর্শক পিয়েরও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তাঁর আশা, আট বছর বয়সী নাতনির জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

পিয়েরের মতো অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ দেখায়, বিক্ষোভের দাবিগুলো কেবল কর্মজীবী বা শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাঁরা।

বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভে আন্তপ্রজন্ম উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটেছে। তরুণেরা শিক্ষা ও কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছেন, আর অভিভাবক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনের প্রত্যাশা তুলে ধরছেন।

বিক্ষোভকারীর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় চার লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট লাখ।

সরকারি হিসাব ও ইউনিয়নগুলোর হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকলেও উভয় হিসাবেই দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিক্ষোভের কারণে ফ্রান্সের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বখ্যাত ল্যুভর জাদুঘর, মুসে দর্সে এবং প্যারিস অপেরা।

ল্যুভর জাদুঘর বন্ধ থাকায় দর্শনার্থীরা সেখানে সংরক্ষিত বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’ দেখার সুযোগ পাননি। বিক্ষোভের কারণে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ওপরও প্রভাব পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৭০ হাজার পুলিশ

বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করতে ফ্রান্সজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এত বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পরও শনিবার রাতে রাজধানী প্যারিস ও মার্সেই শহরে পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

তবে সংঘর্ষে কতজন আহত হয়েছেন, কতজনকে আটক করা হয়েছে কিংবা কী পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। কেউ কেউ পুলিশের বাধাকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভের কারণে জনজীবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটেছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি তাঁদের অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং তরুণদের দাবি সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে শুনছে না—এমন অভিযোগ।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কেউ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে, কেউ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে, আবার কেউ সন্তান ও নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে রাজপথে এসেছেন। তাঁদের বক্তব্যে একটি অভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে—বর্তমান সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।

গত সপ্তাহে কাঁদানে গ্যাসের মুখে পড়ার পরও সন্তানকে নিয়ে আবারও মিছিলে যোগ দেওয়া এমিলি গ্রঁদ্রির বক্তব্য সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, এভাবে হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না; রাজপথে ফিরতেই হতো।

শনিবারের বিক্ষোভে সরকারি হিসাব অনুযায়ী চার লাখ ১০ হাজার এবং ইউনিয়নগুলোর দাবি অনুযায়ী প্রায় আট লাখ মানুষের অংশগ্রহণ ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে চলমান অসন্তোষের ব্যাপ্তি তুলে ধরেছে। তবে এসব দাবি মোকাবিলায় সরকার কী পদক্ষেপ নেবে এবং বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগের বিষয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স