নির্বাচনের আগে জনগণকে ভয় দেখানো হচ্ছে, অভিযোগ শফিকুর রহমানের; সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানালেন বিরোধীদলীয় নেতা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো ইতিবাচক কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগেই জনগণকে ভয় দেখানো হচ্ছে। এ ধরনের ভয়ভীতি ও দলীয় প্রভাবের পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
শনিবার বেলা ১১টায় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসের মুন হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সাংগঠনিক সফরের অংশ হিসেবে তিনি মৌলভীবাজারে যান।
শফিকুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তাঁরা নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু করার চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার দাবি জানাবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই সমান সুযোগ নিশ্চিত হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
সমান সুযোগ নিশ্চিত হলেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জামায়াতের আমির বলেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করার চেষ্টা করা হবে। সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনের আগে আমরা অবশ্যই রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করব। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) আমরা চাইব। যখন সেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নিশ্চয়তা পাব, তখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।’
নির্বাচনে জনগণের মতামত ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা জনগণের অধিকার নিয়ে লড়তে চান। জনগণ যাঁকে ভোট দিয়ে পছন্দ করবে, সেই ব্যক্তিই যেন ক্ষমতায় যেতে পারেন, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও তার আগে সবার জন্য সমান সুযোগ ও ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল নেবে না
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, দেশে একের পর এক অঘটন ঘটতে থাকলে বিরোধী দল নীরব থাকতে পারে না। সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশে একটার পর একটা অঘটন ঘটতে থাকবে আর আমরা চুপ করে বসে থাকব—ইতিহাস কি আমাদের ক্ষমা করবে? সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল নেবে কেন? সরকারের অপকর্ম, অন্যায়–অপরাধের দায় আমরা নেব না।’
সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু নীরব থাকা নয়; বরং দেশের স্বার্থ ও জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করা। সরকারের কোনো ভুল বা অনিয়মের দায় বিরোধী দলের ওপর বর্তায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা
দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা তুলে ধরেন জামায়াতের আমির। তাঁর বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি অন্যায় করলে তিনি যে দলেরই হোন না কেন, নীতির প্রশ্নে তাঁকে ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কেউ অন্যায় করলেও আমরা ছাড় দিইনি। আমরা নীতির প্রশ্নে কাউকে বড় করে দেখব না, নীতিকে বড় করে দেখব।’
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের কোনো দলের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে দেখা উচিত নয়। দল সংকটে পড়লে এসব ব্যক্তি সবার আগে পালিয়ে যান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনীতিতে নৈতিকতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শফিকুর রহমানের বক্তব্য, অন্যায়কারীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নীতির ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যক্রমে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেয়েছি, যিনি সব মন্ত্রণালয়ে সার্ভিস দেন। তার প্রথম কাজ হচ্ছে নিজের মন্ত্রণালয় দেখাশোনা করা। না তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ করলেন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করলেন; না তিনি সমাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারলেন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই।’
তাঁর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব নিজের মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারক করা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করা। কিন্তু মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার এ বক্তব্য সরকারের নিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কার্যক্রমের সমালোচনার অংশ। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পরিসংখ্যান বা বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেননি।
দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন
সম্প্রতি দুর্গাপূজা বড় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সতর্ক ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘দু–তিন দিন আগে দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এ দেশে ক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক দল এ ব্যাপারে সতর্ক ছিল। দেশ আমাদের সবার। এখানে মানুষ তার পছন্দমতো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করবে। এতে অন্য কারও বাধা দেওয়া উচিত নয়।’
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ সবার দেশ এবং প্রত্যেক মানুষের নিজের ধর্ম অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার রয়েছে। অন্য কারও সেই অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া উচিত নয়।
দুর্গাপূজার সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সতর্ক ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
নির্বাচনী পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধী দলের উদ্বেগ
মৌলভীবাজারে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় শফিকুর রহমানের বক্তব্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জনগণের ভোটাধিকার, সরকারের জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এই বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি সমান সুযোগ নিশ্চিত করার শর্ত তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে জনগণকে ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে নির্বাচনী পরিবেশ কীভাবে উন্নত করা হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি।
সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা জানিয়েছেন, সরকারের ভুল বা অনিয়মের দায় বিরোধী দল নেবে না। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, দুর্গাপূজা বড় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই শেষ হওয়াকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন জামায়াতের আমির।
সব মিলিয়ে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী পরিবেশ ও ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়ে সমালোচনা করেছেন শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হওয়া এবং জনগণের পছন্দের প্রতিফলন ঘটাই সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম প্রধান শর্ত।