শূন্য পদের সংকট ও সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির জটিলতায় আটকে আছে পদোন্নতি। ২ হাজার ৮২৩টি অতিরিক্ত পদের প্রস্তাব পাঠানো হলেও হয়নি কার্যকর অগ্রগতি। অন্য ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি হলেও বছরের পর বছর নবম গ্রেডে আটকে আছেন শিক্ষা ক্যাডারের বহু কর্মকর্তা।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়েছে। কোথাও একাধিক ধাপে পদোন্নতি হয়েছে, কোথাও পদস্বল্পতা মোকাবিলায় সুপারনিউমারারি বা সংখ্যাতিরিক্ত পদও সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা। পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সরকারি আদেশ (জিও) জারি হয়নি।
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের। একদিকে শূন্য পদের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে সংকট আরও জটিল হয়েছে। ফলে একই বিসিএস ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা এখনো প্রভাষক পদে কর্মরত রয়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, এই দীর্ঘসূত্রতার দায় কি কেবল পদস্বল্পতার, নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন স্বীকার করছে যে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া কঠিন, তখন সেই পদ সৃষ্টির প্রস্তাব বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ কী—এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর চান পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা।
প্রভাষক প্রায় ১০ হাজার, সহকারী অধ্যাপকের পদ সাড়ে চার হাজার
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক পর্যায়ে কর্মকর্তার সংখ্যা ৯ হাজার ৭৮২। বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে অনুমোদিত পদ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৫১টি। ফলে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়মিত পদোন্নতির সাংগঠনিক সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
এই হিসাবই শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রভাষক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা কর্মরত থাকলেও পরবর্তী পদে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পদ নেই। ফলে যোগ্যতা ও চাকরির অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাচ্ছেন।
তবে পদস্বল্পতা থাকলেই যে পদোন্নতির সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, এমন নয়। প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রয়োজন অনুযায়ী সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করা হলে অনুমোদিত নিয়মিত পদের বাইরে সাময়িক বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত পদে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দাবি, তাঁদের পদোন্নতির জট খুলতে এই ব্যবস্থাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদের প্রস্তাব
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের সমস্যা নিরসনে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রয়াত অধ্যাপক বি এম আবদুল হান্নানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র পাঠানো হয়।
প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ছিল, পদস্বল্পতার কারণে আটকে থাকা যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা। ওই সময়ের হিসাব অনুযায়ী, ৩২তম, ৩৩তম, ৩৪তম, ৩৫তম, ৩৬তম ও ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারি কলেজ জাতীয়করণ বিধিমালা, ২০০০-এর আওতায় আত্তীকৃত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মোট ২ হাজার ৮২৩ জন প্রভাষক সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন।
কিন্তু প্রস্তাব পাঠানোর পরও পদ সৃষ্টির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ। এর মধ্যে ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারাও পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। ফলে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা—দুটিই সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা বিদ্যমান পদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়ায়। ফলে নিয়মিত পদের বিপরীতে শূন্য পদ না থাকায় নতুন করে প্রভাষকদের পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক ডিপিসি সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলেছেন, পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হলে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির বিকল্প নেই বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁদের এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্বীকৃত হওয়ার পরও প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন?
ডিপিসি হয়েছে, জিও হয়নি
শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ২০২৬ সালের ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর তিনটি ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভার মাধ্যমে পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে। কিন্তু সভা শেষ হওয়ার পরও পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারি হয়নি।
ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হওয়া পদোন্নতি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে সভায় সুপারিশ বা সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট বিধি, অনুমোদন ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সরকারি আদেশ জারি না হলে কর্মকর্তারা কার্যত পদোন্নতির সুবিধা পান না। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে এই পর্যায়েই আটকে আছে।
এদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য দুটি পৃথক স্মারকে ডিপিসি সভা আহ্বান করা হয়েছিল। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতির যোগ্যতা ও প্রাপ্যতার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
২৭ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। পরে সেপ্টেম্বর মাসে ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও জিও জারি না হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তাঁদের প্রশ্ন, পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সভা আয়োজন এবং প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরও কেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না? কোন পর্যায়ে ফাইল আটকে আছে, কী ধরনের প্রশাসনিক বা নীতিগত জটিলতা রয়েছে এবং সেগুলো নিরসনে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
অন্য ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি, শিক্ষা ক্যাডারে স্থবিরতা
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিসিএস প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে গত পাঁচ বছরে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি হয়েছে মাত্র একবার।
তাঁদের দেওয়া তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, ৩৬তম বিসিএসের সমসাময়িক অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালে, ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে এবং ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৬ সালে নিয়মিতভাবে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা এখনো নবম গ্রেডের প্রভাষক পদে রয়েছেন।
একই বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল অর্জনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে অভিন্ন হলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ক্যাডারভেদে এমন পার্থক্য কেন তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
তাঁদের মতে, এই সংকটের সমাধান শুধু একটি বা দুটি ব্যাচের পদোন্নতি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যোগ্যতা, চাকরির মেয়াদ ও প্রযোজ্য বিধিমালার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়ার একটি কার্যকর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
এ ধরনের কাঠামো থাকলে পদোন্নতির জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করার প্রবণতা কমবে এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা সহজ হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
পদোন্নতিবঞ্চনার প্রভাব কর্মজীবন ছাড়িয়ে ব্যক্তিজীবনেও
দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাগত হতাশার পাশাপাশি সামাজিক, আর্থিক ও মানসিক চাপও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পদোন্নতিবঞ্চিতদের প্রতিনিধিরা।
থিঙ্কট্যাংক অব সিভিল এডুকেশন ‘দ্য অ্যাডভাইজরস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং পদোন্নতিবঞ্চিত ৩৬তম বিসিএসের প্রভাষক সচিব তালুকদার বলেন, শিক্ষক দিবস, পূজা কিংবা ঈদের মতো উৎসবের আনন্দও পদোন্নতিবঞ্চনার কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিসিএসের প্রাক্-নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর ধরে সিভিল সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রভাষক পদে রয়েছেন। অন্যদিকে তাঁদের তুলনায় ১৩ ব্যাচ জুনিয়র ৪৯তম বিসিএসের নতুন কর্মকর্তারাও একই প্রভাষক পদে যোগ দিচ্ছেন।
একই পদে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বছরের পর বছর অবস্থান করাকে তিনি অস্বাভাবিক প্রশাসনিক বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি কর্মকর্তাদের পেশাগত অগ্রগতি ব্যাহত করার পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক, আর্থিক ও মানসিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সচিব তালুকদার আরও বলেন, সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে যেভাবে উদ্যোগী হয়েছে, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি সংকট নিরসনেও তেমন তৎপরতা দেখা যাবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
নিজেদের হতাশা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, ‘পদোন্নতির ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্র পল্লীতে, শিক্ষা ক্যাডারে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’
মন্ত্রীর বক্তব্যে আশার সঞ্চার, অগ্রগতি না থাকায় হতাশা
পদোন্নতির দাবিতে চলতি বছরের ৩০ জুন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এতে ২৪তম থেকে ৩৮তম বিসিএস পর্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং পদস্বল্পতা নিরসনে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়।
এরপর ১৩ অক্টোবর বগুড়ায় ৪৯তম বিসিএসের নবীন কর্মকর্তাদের যোগদান অনুষ্ঠানে শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি সংকটের বিষয়টি সামনে আসে। অনুষ্ঠানে নবীন কর্মকর্তারা মন্তব্য করেন, বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি হতাশায় ভুগছেন। এ সময় উপস্থিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁরা।
মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘Noted down clearly and put it in the file, what they demand.’ অর্থাৎ, কর্মকর্তারা কী দাবি করছেন, তা স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত করে ফাইলে রাখতে বলেন তিনি।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তাঁরা মনে করেছিলেন, বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু পূজার আগে পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তাঁদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দায় কি শুধু শূন্য পদের, নাকি প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতারও?
শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি সংকটের ক্ষেত্রে শূন্য পদের সীমাবদ্ধতা একটি বাস্তব সমস্যা। প্রভাষক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা থাকলেও সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে অনুমোদিত পদ তুলনামূলক কম। ফলে নিয়মিত পদে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠানোর পরও তা বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা জরুরি। বিশেষ করে, ২ হাজার ৮২৩টি অতিরিক্ত পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের পর নতুন ব্যাচের কর্মকর্তারাও পদোন্নতির যোগ্য হওয়ায় বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পদোন্নতির জন্য সুপারনিউমারারি পদ অপরিহার্য বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও মত দিয়েছেন। তাহলে প্রস্তাবটির বর্তমান অবস্থা কী, কোন দপ্তর বা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আটকে আছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আর কী পদক্ষেপ প্রয়োজন—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত পদগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রভাব, পদোন্নতির যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণের বিষয়গুলোও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এই সংকটের সমাধান
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরকারি কলেজে পাঠদান, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এবং উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত থাকা শুধু ব্যক্তিগত কর্মজীবনের সমস্যা নয়; এটি জনবল ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিবেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকলে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কর্মজীবনে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কর্মীদের মনোবল ও পেশাগত প্রত্যাশায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তাদের দাবি, তাঁদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক পদোন্নতি নয়, বরং ক্যাডারের পদকাঠামো পুনর্মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি এবং নিয়মিত পদোন্নতির সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকা, প্রস্তাবের অগ্রগতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার।
এখন প্রয়োজন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহি
নতুন সরকারের সময়েও শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি সংকটের সমাধান না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হলেও জিও জারি না হওয়া এবং সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকার বিষয়টি তাঁদের প্রধান উদ্বেগ।
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের মনোযোগের পাশাপাশি প্রশাসনিক পর্যায়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। প্রস্তাবিত পদ সৃষ্টির ফাইলের বর্তমান অবস্থা প্রকাশ, বিলম্বের কারণ নির্ধারণ এবং পদোন্নতির বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা ঘোষণা করা হলে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমতে পারে।
তবে এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দপ্তরকে দায়ী করার আগে ফাইলের গতিপথ, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। একইভাবে, শিক্ষা ক্যাডারকে ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে কিংবা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কেউ কাজ করছেন—এ ধরনের সন্দেহের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সব মিলিয়ে, শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি সংকট এখন কেবল কয়েক হাজার কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দাবি নয়; এটি সরকারি জনবল ব্যবস্থাপনায় সমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। তাই মূল প্রশ্নটি রয়ে যাচ্ছে—পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, এবং এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কবে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে?
লেখক: সাফিয়া জান্নাত সকাল ও আজরিন জান্নাত সেবা, সদস্য, দ্য অ্যাডভাইজরস।