ঢাকা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক স্খলন: প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা দাবি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

শিক্ষার্থী নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনার কথা তুলে ধরেছে সংগঠনটি; সুরক্ষা কমিটি কার্যকর রাখা, মনিটরিং সেল গঠন ও হটলাইন চালুর ওপরও গুরুত্ব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক স্খলন, অনৈতিক আচরণ কিংবা শিক্ষার্থী নিপীড়নের অভিযোগে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত—উভয় ধরনের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এ ধরনের ঘটনায় কোনো ধরনের শিথিলতা বা আপস করা উচিত নয় বলে মনে করে সংগঠনটি। একই সঙ্গে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান এ দাবি জানান।

সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলনের অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটি এ বিবৃতি দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনৈতিক আচরণ কিংবা শিশু নিপীড়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও সমর্থনযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

হেফাজতের নেতারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর তা উপেক্ষা করা কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়।

অভিযোগ তদন্তে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন

শিক্ষার্থী নিপীড়ন প্রতিরোধে কওমি মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের বিষয়টি বিবৃতিতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম জানিয়েছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থী নিপীড়ন প্রতিরোধে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এটি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা কর্তৃপক্ষ।

নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই এ ধরনের কমিটি থাকলে সেটিকে সক্রিয় ও কার্যকর রাখতে হবে। শিক্ষার্থী নিপীড়ন কিংবা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনার কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্রুত তদন্তের এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে কিংবা কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার কারণে কোনো শিক্ষার্থী ঝুঁকির মধ্যে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তবে অভিযোগের দ্রুত তদন্তের পাশাপাশি নিরপেক্ষতা, প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে প্রযোজ্য বিধি ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

সুরক্ষা কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকলে অধিভুক্তি বাতিলের ঝুঁকি

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি গঠনের পাশাপাশি অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকলে, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকলে অথবা অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধিভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে।

হেফাজতের নেতাদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে কমিটি গঠন করলেই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি স্পষ্ট করতে হবে এবং অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিপীড়ন প্রতিরোধের জন্য অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, প্রতিবেদন তৈরি এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। পাশাপাশি অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা এবং অভিযোগের কারণে যেন সে কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রতিশোধের শিকার না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বিবৃতিতে মাদ্রাসা বোর্ডগুলোকে শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন এবং অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন চালুর নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনিয়মের অভিযোগ জানানোর একটি নির্দিষ্ট মাধ্যম পাবেন।

স্কুল ও মাদ্রাসায় কঠোর নীতিমালা অনুসরণের আহ্বান

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতারা সব স্কুল ও মাদ্রাসাকে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

শিক্ষার্থীরা যেন ভয়, চাপ কিংবা হয়রানির শিকার না হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিরাপদ রাখা জরুরি। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের দায়িত্ব ও আচরণবিধি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও নজরদারি প্রয়োজন বলে বিবৃতির বক্তব্যে উঠে এসেছে।

সিসি ক্যামেরায় নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে অনিয়ম প্রতিরোধ এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

তবে সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল তদারকি এবং শিক্ষার্থী সুরক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নও জরুরি। শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি দিয়ে সব ধরনের অনৈতিক আচরণ বা নিপীড়ন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সচেতনতা তৈরি, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ সুযোগ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর কাঠামো থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার দায়িত্বে ছাড় নয়

বিবৃতির শেষাংশে হেফাজতে ইসলামের নেতারা শিশুদের নিরাপদ শৈশব, সুশিক্ষা এবং সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য, আজকের শিশুশিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্বে কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনৈতিক আচরণ বা নিপীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

সব মিলিয়ে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি জোরদার, অভিযোগ তদন্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা অনুসরণ, সুরক্ষা কমিটি কার্যকর রাখা এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সূত্র: হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতি।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স