ঢাকা

বর্তমান সংসদের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়, প্রশ্ন তুললেন নাহিদ ইসলাম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য ও জনগণের কণ্ঠস্বরের মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ এনসিপি আহ্বায়কের; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি খাতে ব্যর্থতার দায়ে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, ৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভের ডাক

বর্তমান জাতীয় সংসদ পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্যের কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না। একই সঙ্গে জনগণের কণ্ঠস্বরও যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এনসিপির একটি প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা। ওই কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়।

প্রচারপত্র বিতরণের আগে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত পথসভায় নাহিদ ইসলাম বর্তমান সংসদের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রশাসকদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।

‘এই সংসদের মূল্য আর দুই আনাও নেই’

পথসভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর পর যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নতুন জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, সেই সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে এখন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই জাতীয় সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, এই জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কথার কোনো মূল্যায়ন নেই। জনগণের কণ্ঠস্বরের কোনো মূল্যায়ন নেই।’

সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা ও জনগণের মতামতের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের কার্যক্রমে সেই মূল্যায়নের ঘাটতি রয়েছে।

তবে সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, সে বিষয়ে নিজের সন্দেহ প্রকাশ করলেও সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য মূলত সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা ও জনগণের কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব নিয়ে অসন্তোষের প্রতিফলন।

প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি

সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদে নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে পারেন—স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম এ বিষয়ে আপত্তি জানান। তিনি প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বানও জানান।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসকদের আবার স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি কোন ধরনের গণতন্ত্র? সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদে যত প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।’

এনসিপির আহ্বায়কের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপির ঘোষিত মেয়রপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁরা দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখতে চান না। পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্বে থাকাকালে দেশে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানান। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান বা নির্দিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত তিনি ওই পথসভায় তুলে ধরেছেন কি না, তা সরবরাহ করা বিবরণে উল্লেখ নেই।

জ্বালানি খাতে ব্যর্থতার দায়ে জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এ খাতে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে জ্বালানিমন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হবে।

এনসিপির ঘোষিত ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ কর্মসূচির অন্যতম বিষয় হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি জ্বালানি খাতের এসব বিষয় সামনে এনে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে দলটি।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে যে কার্যক্রম চলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে যে নাটক চলছে, যে প্রহসন চলছে, এই প্রহসন বন্ধ করতে হবে। এই কমিটিকে জনগণ আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত করেছে।’

তাঁর বক্তব্যে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের পদ্ধতি বা এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ওই কর্মসূচিতে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়েছে কি না, তা সরবরাহ করা তথ্যে স্পষ্ট নয়।

৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা।

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে শনিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। এ সময় দলের নেতারা পথসভায় বক্তব্য দেন এবং ঘোষিত কর্মসূচির বিষয়ে প্রচার চালান।

যাত্রাবাড়ীর কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপির ঘোষিত মেয়রপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, দলের রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব এস এম শাহরিয়া প্রমুখ।

একই দিন বিকেলে ঢাকার উত্তরায়ও ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ সামনে রেখে প্রচারপত্র বিতরণ করে দলটি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং সারোয়ার তুষারসহ দলের অন্যান্য নেতারা।

সংসদ ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনা এবং সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে। এসব বিষয়ে সরকারের জবাবদিহি ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে এনসিপি।

সংসদের মেয়াদ নিয়ে তাঁর সন্দেহ প্রকাশ এবং দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সরকারের কার্যক্রম নিয়ে দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রশাসকদের অংশগ্রহণের সুযোগ না রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।

তবে বর্তমান সংসদ পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করবে কি না, সে বিষয়ে নাহিদ ইসলামের মন্তব্য তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও আশঙ্কা হিসেবে বিবেচ্য। সংসদের মেয়াদ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাংবিধানিক বিধান, সংসদের কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভের মাধ্যমে এসব দাবিতে জনসমর্থন সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়েছে এনসিপি। দলটির ঘোষিত কর্মসূচিতে কত মানুষের অংশগ্রহণ হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবির বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হবে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স