রয়টার্স | দোহা
মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের মধ্যে সংঘাত—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা। সম্প্রতি গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের এই তিন সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা সোমবার ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কমানো এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকটের সমাধান খুঁজে বের করাই এই সফরের উদ্দেশ্য। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির পর ইরান এবং মক্কা জোটের তিন সদস্যদেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে ছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ির আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই।
পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। অন্যদিকে তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন।
বৈঠকে চার দেশের প্রতিনিধিরা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ইরানের বার্তা সংস্থা ফারসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠক শেষে তেহরানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছেন চার দেশের প্রতিনিধিরা। তবে বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি, যৌথ পদক্ষেপ কিংবা সংঘাত নিরসনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
গত আগস্টে গঠিত হয় মক্কা প্রতিরক্ষা জোট
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত আগস্টে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে সই করে। জোটটির সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিদের তেহরান সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক সংঘাত ও নিরাপত্তাসংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতিও আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে তেহরানের বৈঠকে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বৈঠকটি কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের উদ্যোগ, নাকি এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আরও বড় কোনো পরিবর্তনের পথ তৈরি হচ্ছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হলেও সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও কাতার
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
রোববার কাতারের একজন মধ্যস্থতাকারীও তেহরান সফর করেন। এর আগে জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি হয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে যায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে আবার সংঘাত শুরু হয়।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এর মধ্যে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
সৌদি আরবের তেল পাইপলাইন ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দাবি হুতিদের
এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেই দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। সোমবার গোষ্ঠীটি জানায়, তারা সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিমমুখী অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশন এবং রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার দাবি দেশটির জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছিল, আগের হামলার পর বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনালে আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে সোমবারের হামলার দাবির ফলে বিমানবন্দরের কার্যক্রমে নতুন করে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের বৈঠক এবং একই সময়ে সৌদি আরবে হামলার দাবি—মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। একদিকে আঞ্চলিক দেশগুলো সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সংঘাতের বিস্তার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
তেহরানের বৈঠকে চার দেশের প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হলেও এর বাস্তব ফলাফল এখনো পরিষ্কার নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ, সৌদি আরব-হুতি বিরোধ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক—এসব বিষয় আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।