ঢাকা

সিপিবির কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, নেতা–কর্মীদের ওপর হামলা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর বিক্ষোভ মিছিল করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা-কর্মীরা। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সিপিবির নেতাদের অভিযোগ, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি এ হামলা চালিয়েছেন।

সিপিবির নেতা-কর্মীরা জানান, কিছুক্ষণ বাগ্‌বিতণ্ডা চলার পর তাঁদের দুজনকে মারধর করা হয়। পরে সিপিবির নেতা-কর্মীরা পল্টন মোড় থেকে নিজেদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফিরে আসেন। সেখানেও দুই পক্ষের মধ্যে কিছু সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এরপর হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। রাত ১১টার পর তাঁরা সেখান থেকে চলে যান বলে সিপিবির নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশকে অবস্থান করতে দেখা যায়। কার্যালয়ের পাশেও দলটির কয়েকজন নেতা-কর্মী অবস্থান করছিলেন।

‘সরকারকে নিজের দলের লোকজন সামলাতে হবে’

হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখার পরও সিপিবির ওপর হামলা হয়েছে। সরকারকে নিজের দলের লোকজনকে সামলাতে হবে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের সামনে এসে কীভাবে হামলা চালানো হয়।

জলি তালুকদারের অভিযোগ, হামলার পর সিপিবির সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন পল্টন থানার ওসি আরিফুল আলম।

প্রথম আলোকে ওসি আরিফুল আলম বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর ১৫ থেকে ২০ জন পল্টন এলাকায় একটি মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কিছু লোক অভিযোগ তোলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সিপিবির কার্যালয় ভাঙচুর কিংবা কাউকে আটক করার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।

তবে গভীর রাতে ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন।

ছাত্রদল বলছে, তারা বিষয়টি জানে না

সিপিবির কার্যালয়ের সামনে হামলা ও বিক্ষোভে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, সিপিবির কার্যালয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন—এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে তাঁরা অবগত নন।

তিনি বলেন, ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো নেতা-কর্মীকে এ ধরনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। প্রকৃত ঘটনা কী, তা খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিপিবির নেতারা হামলাকারীদের যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কথা বললেও তাঁদের প্রকৃত পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

‘স্লোগানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হামলা হয়ে থাকতে পারে’

ঘটনার পর রাত সোয়া ১২টার দিকে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি এ হামলাকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঘোষণা দিয়ে তাঁদের পার্টি অফিসে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, তারাই ওই হামলার চেষ্টা করেছিল বলে তাঁর অভিযোগ। সে সময় সিপিবির নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা সফল হতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আজকের হামলার মধ্য দিয়ে তারা সেই ব্যর্থতার আক্রোশ মেটাতে চায় বলে আমাদের মনে হচ্ছে।’

হামলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, দীপক শীলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর মুক্তির পর একটি মিছিল হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। ওই মিছিলে ‘জয় সমাজতন্ত্র’ ও ‘জয় সর্বহারা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। হামলাকারীরা এসব স্লোগানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হামলা করে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।

তবে কোনো স্লোগানই একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার অজুহাত হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন।

‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান: সিপিবি

‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এই স্লোগান দিয়ে অনেক অন্যায় করেছে বলে অভিযোগ থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে অন্যরা স্লোগানটি ব্যবহার করা ছেড়ে দেবে।

তিনি বলেন, ‘কেউ আমাদের মিছিল থেকে “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়ে থাকলেও তা কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে হামলার অজুহাত হতে পারে না।’

হামলাকারীদের পরিচয় নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তাঁর ভাষ্য, হামলাকারীরা নিজেদের একটি রাজনৈতিক দলের লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন। তবে তাঁদের দেওয়া পরিচয় সত্য কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বললে হামলাকারীরা তাঁদের দলের লোক নন বলে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকার কথা তুলে ধরল সিপিবি

সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সিপিবির ভূমিকার কথা তুলে ধরেন দলটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে তাঁরা ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছিলেন। ২ আগস্ট ‘দ্রোহযাত্রা’ করেছিলেন তাঁরা।

এরপরও সিপিবিকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ও ‘পতিত সরকারের দোসর’ বলা হচ্ছে উল্লেখ করে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, যারা এসব অভিযোগ তুলছে, তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।

সিপিবির অতীতেও বিভিন্ন সময়ে হামলা ও নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এরশাদের শাসনামলে দলটির কার্যালয়ে হামলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে গানপাউডার ব্যবহার করে পার্টি অফিসের তিনতলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

এ ছাড়া পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর সিপিবিকে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। এত প্রতিকূলতার পরও দলটিকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘জীবন দেব, তবু আক্রমণ বরদাশত করব না’

হামলার সময় দলটির নেতা-কর্মীরা নিজেদের কার্যালয় রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন বলে জানান সিপিবির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, গভীর রাতে হামলা করতে এলে বিভিন্ন এলাকা থেকে কমরেডরা এসে পার্টি অফিস রক্ষা করেন।

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘আমরা জীবন দেব, তবু কমিউনিস্ট পার্টির ওপর কোনো আক্রমণ বরদাশত করব না।’

মব তৈরি করে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, যারা মাজার ভেঙেছে, পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে এবং রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা করেছে, তাদের উদ্দেশে সিপিবির অবস্থান স্পষ্ট। মব সৃষ্টি করে কমিউনিস্ট পার্টির কোনো ক্ষতি করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করবে সিপিবি

হামলার ঘটনার বিস্তারিত জানতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি বলেন, তাঁরা ফুটেজ দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন। এরপর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।

ঘটনাটি নিয়ে সিপিবি ও পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। সিপিবির নেতারা হামলা, মারধর ও দুই সদস্যকে আটকের অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, পুলিশ কার্যালয় ভাঙচুর বা আটকের ঘটনা অস্বীকার করেছে। ছাত্রদলও তাদের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার বিষয়ে অবগত নয় বলে জানিয়েছে। ফলে হামলাকারীদের পরিচয় ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত করতে আরও তথ্য যাচাই প্রয়োজন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স