ঢাকা

ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দিন, নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণ আজ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

রয়টার্স

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন আজ মঙ্গলবার। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন, নাকি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মোড় আসবে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নিরাপত্তাব্যর্থতা এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে ইসরায়েলে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শিবিরের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারিত হলেও ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেই ফিলিস্তিনিদের জীবনে স্বস্তি ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। গাজা ও ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ইসরায়েলের সামগ্রিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

নেসেটের ১২০ আসনে লড়াই

ইসরায়েলে এবারের নির্বাচনে ভোটার প্রায় ৭৩ লাখ। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের জন্য ভোট হচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য কোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। তাঁরা পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। নির্বাচনের আগে দলগুলো প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে এবং প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টে আসন পায়। নেসেটে আসন পেতে কোনো দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়।

এই ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট বা সমঝোতা প্রয়োজন হয়। ফলে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলই যে সরকার গঠন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন আদায় করতে পারাই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে ওঠে।

নেতানিয়াহুর পাশে ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো

নেতানিয়াহু তাঁর দল লিকুদকে নিয়ে ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর সম্ভাব্য মিত্রদের মধ্যে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। নেতানিয়াহুর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবে বেন-গভির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী এবং স্মোত্রিচ অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমকেও নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই দলগুলোর সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন। তবে নির্বাচনে তাঁর শিবিরের আসনসংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে জোটের সমীকরণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে ছোট দলগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি এবং রাজনৈতিক সমঝোতাই তাঁর ক্ষমতায় ফেরার পথ নির্ধারণ করবে।

বিরোধী শিবিরে কে হবেন প্রধানমন্ত্রী

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরে রয়েছে ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটসসহ বিভিন্ন দল। এই শিবির নির্বাচনে জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা স্পষ্ট করে ঘোষণা করা হয়নি।

তবে সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশারের নেতা গাদি আইজেনকটকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। টুগেদার দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সরকারপ্রধান হওয়ার দাবিদার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

বিরোধী দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করা এবং সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার কারণে নির্বাচনের পর তাদের মধ্যে সমঝোতা কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

জরিপে এগিয়ে নেই কোনো পক্ষ

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত শুক্রবারের একটি জরিপে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো পক্ষেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা দেখা যায়নি।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এবং বিরোধী শিবিরের ইয়াশার—দুটি দলই ২২টি করে আসন পেতে পারে। টুগেদার ১৪টি, ডেমোক্র্যাটস ও জয়েন্ট লিস্ট ৯টি করে আসন পেতে পারে বলে জরিপে আভাস দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জিউইশ পাওয়ার, শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৮টি করে আসন পেতে পারে। ইসরায়েল বেইতেনু ও রিলিজিয়াস জায়োনিজমের আসনসংখ্যা হতে পারে ৭টি করে। আর আরব রাজনৈতিক দল রা’আম পেতে পারে ৫টি আসন।

জরিপের এই হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর শিবিরের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫৩। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫২। অর্থাৎ, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারছে না।

তবে নির্বাচনী জরিপের ফলাফল চূড়ান্ত নয়। প্রকৃত ভোটের ফলাফলে আসনসংখ্যার হিসাব বদলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোন দল কতটি আসন পায় এবং নির্বাচনের পর কারা কাকে সমর্থন দেয়, তার ওপরই সরকার গঠনের সমীকরণ নির্ভর করবে।

সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে আরব দলগুলো

নেতানিয়াহুর শিবির ও বিরোধীদের কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ নেতা, তাঁদের মধ্যে গাদি আইজেনকটও রয়েছেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পথ আরও জটিল হতে পারে।

রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তত দিন নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ভোটের ফলাফল তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে নাও হতে পারে।

নেতানিয়াহু এ পর্যন্ত ছয় মেয়াদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনের পর আবার সরকার গঠন করতে পারলে এটি হবে তাঁর সপ্তম মেয়াদ।

৭ অক্টোবরের হামলা ও নিরাপত্তাব্যর্থতা বড় ইস্যু

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর এটিই দেশটিতে প্রথম নির্বাচন। ওই হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ওই হামলা ঠেকাতে না পারার দায়।

বিরোধী নেতারা এ ঘটনায় জবাবদিহি এবং ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু এ ঘটনার দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ও এবারের নির্বাচনের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির কারণে ইসরায়েলি সরকারের নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমালোচনা রয়েছে।

এ ছাড়া অতি রক্ষণশীল ইহুদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি এবং রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এসব প্রশ্ন নেতানিয়াহুর জোটের অভ্যন্তরীণ সমর্থন এবং বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনী অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।

নেতানিয়াহুর বিদায় কি ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বস্তি আনবে?

ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। তবে নেতৃত্বের পরিবর্তন ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তাঁদের কেউ কেউ।

গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়ান আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘নেতানিয়াহুর হারলেও ইসরায়েলের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তারপরও আমি নেতানিয়াহুর পরাজয় চাই।’

তাঁর এই বক্তব্যে নেতানিয়াহুর প্রতি বিরোধিতা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি ইসরায়েলের সামগ্রিক নীতিতে পরিবর্তন আসা নিয়ে সংশয়ও উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের গঠন ও নীতির দিকনির্দেশনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে জরিপে কোনো পক্ষের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার আভাস না থাকায় ভোটের পর সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি বিরোধীরা নতুন সরকার গঠন করবেন—তা নির্ভর করবে ভোটের ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স