ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২৫২টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার খবরের মধ্যে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মাদ্রাসা পরিচালকদের নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করেছে উত্তর প্রদেশের দেওবন্দের ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ। আগামীকাল ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এ সম্মেলনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মাদ্রাসার প্রতিনিধি অংশ নেবেন বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
সর্বভারতীয় মাদ্রাসা পরিচালকদের সংগঠন ‘রাবিতা-ই-মাদারিস ইসলামিয়া’র ব্যানারে আয়োজিত এই সম্মেলনে ইসলামি শিক্ষার মানোন্নয়ন, মাদ্রাসার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। মাদ্রাসা পরিচালনায় বিদ্যমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায় নিয়েও আলোচনা হবে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসাগুলোর অনুমোদন, অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা যাচাইয়ে জরিপের পর একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৫২টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশের পাশাপাশি আরও ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আরও কিছু বেসরকারি মাদ্রাসা বন্ধের বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অনুমোদনহীন মাদ্রাসার নিবন্ধন ও কার্যক্রম যাচাইয়ের উদ্যোগের মধ্যে দেওবন্দের এই সম্মেলনকে মাদ্রাসা পরিচালনা ও শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেওবন্দে পাঁচ হাজার প্রতিনিধির সম্মেলন
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্যোগে উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ শহরে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার মাদ্রাসার প্রতিনিধি অংশ নেবেন বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
সম্মেলনের আয়োজক সংগঠন ‘রাবিতা-ই-মাদারিস ইসলামিয়া’ দেশটির মাদ্রাসা পরিচালকদের একটি সর্বভারতীয় সংগঠন। এর ব্যানারে আয়োজিত সম্মেলনে ইসলামি শিক্ষার মান উন্নত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনাব্যবস্থা আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে মাদ্রাসার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ, আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের ওপর। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খোঁজার বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে।
সম্মেলনের আগে দারুল উলুমের কার্যনির্বাহী কমিটি ‘মজলিস-এ-আমিলা’ পূর্ববর্তী বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করবে।
প্রতিষ্ঠানটির রেক্টর মুফতি আবুল কাসিম নোমানি জানিয়েছেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ২৫২ মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ
পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসার অনুমোদন ও অবকাঠামো যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত জরিপের পর ২৫২টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুতর অনিয়ম এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির অভিযোগে আরও ১০০টি মাদ্রাসাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদ্রাসাগুলোর অবকাঠামো, অনুমোদন ও নিবন্ধন যাচাইয়ে ব্যাপক জরিপ শুরু হয়। সেই জরিপের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা ও পরিচালনাগত ঘাটতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে—এমন আরও ২৫০টি বেসরকারি মাদ্রাসা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমিক নজরদারির আওতায় আসতে পারে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
জরিপে অনুমোদিত ও অননুমোদিত মাদ্রাসার চিত্র
মাদ্রাসা বোর্ডের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২ হাজার ১৩২টি মাদ্রাসা সরকারি বৈধ অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ২ হাজার ৩৯৬টি মাদ্রাসা সরকারি নিবন্ধন ছাড়াই চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসার নিবন্ধন ও অনুমোদন যাচাইয়ের ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে কোন শ্রেণির প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের স্বীকৃতি বা অনুমোদনের আওতায় রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানের আইনি অবস্থান একভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রশাসন কীভাবে যাচাই ও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিবন্ধন ও অবকাঠামোগত শর্ত পূরণ না করার অভিযোগের পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
মালদহে সবচেয়ে বেশি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ
মাদ্রাসা বোর্ডের সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় সবচেয়ে বেশি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জেলায় ৪৫টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের তালিকায় রয়েছে।
এর পরের তালিকায় রয়েছে উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া জেলা। এসব জেলায় কতটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ পেয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া হয়নি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাদের জবাব পর্যালোচনা করা হবে। সন্তোষজনক উত্তর না পেলে পরবর্তী সময়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
কলকাতায় মাদ্রাসাশিক্ষার ঐতিহাসিক পটভূমি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় আড়াই শ বছর আগে ১৭৮০ সালে কলকাতায় প্রথম অনুমোদিত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসাশিক্ষার বিস্তার ঘটে।
রাজ্যের মাদ্রাসাগুলোতে প্রধানত মুসলিম শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করলেও কিছু প্রতিষ্ঠানে হিন্দু শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। ফলে মাদ্রাসা বন্ধের উদ্যোগের প্রভাব শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে, সেগুলো বন্ধ হলে শিক্ষার্থীদের বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।
মাদ্রাসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়নে জোর
দেওবন্দের সম্মেলনে মাদ্রাসা পরিচালনার প্রশাসনিক ও আর্থিক দিকগুলো গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের হিসাব সংরক্ষণ, নথিপত্রের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মাদ্রাসাগুলোর পরিচালনাব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে অনুমোদন ও অবকাঠামো যাচাইয়ের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ায় মাদ্রাসা পরিচালকদের সামনে প্রশাসনিক নিয়মকানুন মেনে চলার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে বন্ধের নির্দেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য ছাড়া পদক্ষেপগুলোর সামগ্রিক প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।
সব মিলিয়ে, একদিকে পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসার অনুমোদন ও পরিচালনাব্যবস্থা যাচাই করে প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ চলছে, অন্যদিকে দেওবন্দে হাজারো মাদ্রাসা প্রতিনিধির সম্মেলনে শিক্ষার মান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হতে যাচ্ছে। ভারতের মাদ্রাসাশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে এই দুই ধারার ঘটনাপ্রবাহে প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা, পরিচালনাগত জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।