বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে নতুন করে ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। এর মধ্যে ৪ হাজার উপপরিদর্শক (এসআই) সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি কনস্টেবল পদে নেওয়া হবে আরও ১০ হাজার জন। এ ছাড়া সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে ৪০০ থেকে ৫০০ জন নিয়োগ দিতে বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে এসআই ও কনস্টেবল পদে নতুন নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) সংশোধন করা হয়েছে।
এসআই নিয়োগে পরিবর্তন, থাকছে না বিভাগীয় পদোন্নতির কোটা
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পুলিশের এসআই পদের অর্ধেক পূরণ করা হতো বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে। বাকি অর্ধেক পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হতো। সে হিসাবে এবারও ৪ হাজার পদের মধ্যে ২ হাজার পদে বিভাগীয় পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা ছিল।
তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার সব কটি পদেই সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ৪ হাজার এসআই সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এসআই ও কনস্টেবল মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তে বিভাগীয় পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরাসরি নিয়োগের কারণে অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির সুযোগ কমে গেলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের নিয়োগ অব্যাহত থাকলে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে।
বিশেষ বিসিএসে ৪০০–৫০০ এএসপি নিয়োগের পরিকল্পনা
পুলিশের কর্মকর্তা পর্যায়ে জনবল বাড়াতেও উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, সহকারী পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ দিতে বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করা হতে পারে। এটি ৫২তম বিসিএস হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে ৪০০ থেকে ৫০০ জন এএসপি নিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নিয়োগের পর তাঁদের মৌলিক প্রশিক্ষণের সময়সীমা কিছুটা কমিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অতীতের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, নতুন নিয়োগে যাচাই জোরদার
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কনস্টেবল, এসআই ও পুলিশ সার্জেন্ট পদে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। এই সংখ্যা পুলিশ বাহিনীর মোট সদস্যের প্রায় অর্ধেক। ওই সময়ের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশে নতুন সদস্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসআই ও কনস্টেবল পদে নতুন পদ সৃষ্টির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা করতে পুলিশ প্রবিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এবার এককালীন এই পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার আবারও সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারবে।
কীভাবে অনুমোদন পেল নিয়োগের প্রস্তাব
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, নতুন পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয় পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবের মাধ্যমে। পরে সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার পর বুধবার সচিব কমিটির বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।
প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নতুন পদ সৃষ্টি ও প্রশাসনিক কাঠামোসংক্রান্ত প্রস্তাব বিবেচনা করে। ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
নিয়োগে গোয়েন্দা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও পটভূমি যাচাইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করার পরই চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে জনবল ঘাটতি পূরণ, মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও কার্যকর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে সরাসরি নিয়োগ ও বিভাগীয় পদোন্নতির ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে।