ঢাকা

শেষ চার মাস মন্ত্রণালয়ে কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিলাম: মাহফুজ আলম

-


তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শেষ চার মাস তাঁকে কার্যকরভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ করেছেন মাহফুজ আলম। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে ‘রাষ্ট্রকল্প লাইব্রেরি’ নামের একটি সংগঠন।

মাহফুজ আলম বলেন, শেষ কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রায় নিষ্ক্রিয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরোনো ধারার মিডিয়া ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন ধারার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকেই মূলত তাঁকে কাজের সুযোগ থেকে দূরে রাখা হয়।

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর ২৮ আগস্ট মাহফুজ আলম প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ওই বছরের ১০ নভেম্বর তিনি উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিলেও শুরুতে কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাননি। পরে নাহিদ ইসলামের পদত্যাগের পর ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করা পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহফুজ আলম বলেন, মিডিয়া খাত নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কেবল সাংবাদিক নয়, বরং প্রভাবশালী পুঁজিপতি ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীকেও মোকাবিলা করতে হয়। যাঁরা গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করেন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখেন, তাঁদের প্রশ্নে প্রকৃত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, যাঁরা সহজেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, সেই বাস্তবতায় সংস্কার বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, পাঁচ থেকে সাতটি নতুন গণমাধ্যম অভ্যুত্থানের চেতনা, জুলাই আন্দোলন ও তরুণদের পক্ষে কাজ শুরু করায় পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এ কারণেই নতুন উদ্যোগগুলো বাধার মুখে পড়েছে।

নিজের অবস্থান প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন, বাংলাদেশেই তাঁকে বসবাস করতে হবে—এই বাস্তবতায় চারপাশে থাকা শত্রুতা ও আপসকামী শক্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া খুবই কঠিন। তিনি বলেন, যতটুকু সাহস দেখানোর চেষ্টা করেছেন, ততটুকুই তাঁকে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গ যদি সহযোগিতা না করে এবং দালালির অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আবার আইনি সুযোগে আগের অবস্থানে ফিরে যায়, তার দায় এককভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপানো যায় না।

তিনি আরও বলেন, যেসব অর্থশালী গোষ্ঠী এখনও অপপ্রচার ও ভুল তথ্য ছড়ানোর পেছনে অর্থ জোগাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। এসব কাজ তথ্য মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়। তিনি স্পষ্ট করেন, তিনি কোনোভাবেই গণমাধ্যম বন্ধ বা দমন করার পথে যেতে চাননি; বরং নতুন ধারার গণমাধ্যম বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তবে সে সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্র সংস্কার বা নতুন বন্দোবস্তের প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন, বিষয়টি এখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় হাস্যকর হয়ে উঠেছে। নানা সভা–সেমিনারে বড় বড় কথা বলা হলেও বাস্তবে কিছুই করা যায়নি। তাঁর মতে, পুরোনো ব্যবস্থার লোকদের সঙ্গে সমঝোতা করে বা তাদের ওপর ভর করে কখনোই নতুন বন্দোবস্ত গড়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যদি ৫ আগস্টের আগের দিনের সাহস আজও বজায় থাকত, তাহলে ক্ষমতার কাঠামোয় ইতোমধ্যে বড় পরিবর্তন আনা যেত।

তিনি আরও জানান, যে নতুন রাজনৈতিক দল একসময় মানুষের স্বপ্নের প্রতীক ছিল, তারা একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের কারণেই তিনি আর তাদের সঙ্গে নেই। মাহফুজ আলম বলেন, অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক দলগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে যে ভূমিকা রেখেছিল, তা একটি ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চাই—আর সেই ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য অতীতকে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।




কমেন্ট বক্স