আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে চারটি মৌলিক সংস্কার ইস্যুতে দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে ভোটের এক মাস আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থনে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হওয়ায় জনমনে এবং রাজনৈতিক মহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি প্রচারণার ধরণ ও কৌশল
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ডিজিটাল ও মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে:
ডিজিটাল ক্যাম্পেইন: প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড পেজে ‘হ্যাঁ-তে সিল দিন’ শীর্ষক ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা: অভিযোগ উঠেছে যে, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে এই প্রচারণায় সম্পৃক্ত হওয়ার মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের শাখাগুলোতে ব্যানার এবং শিক্ষকদের প্রচারণায় যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মাধ্যম: জুমার খুতবা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পোশাক কারখানার সামনে প্রচারণার মাধ্যমে জনমত গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণভোটের মূল বিষয়বস্তু
ভোটারদের মূলত চারটি প্রধান প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী রূপরেখা।
নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়া।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন।
‘জুলাই সনদ’-এ বর্ণিত ৩০ দফা সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন (যেমন: প্রধানমন্ত্রীর ১০ বছরের মেয়াদকাল এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা)।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
জামায়াতে ইসলামী: সংস্কারের পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দলটি।
বিএনপি: দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণভোট নিয়ে প্রচারণা চালানো তাদের কাজ নয়; জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। তারা তাদের নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এনসিপি: নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছে।
নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ
সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকসহ অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, সরকারের এই সক্রিয় ভূমিকা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগের নীতিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তাদের উদ্বেগের প্রধান কারণগুলো হলো:
প্রশাসনের দ্বিমুখী ভূমিকা: জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) একইসাথে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সরকারি প্রচারণার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করলে মাঠ পর্যায়ে পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা তৈরি হয়।
আইনি চ্যালেঞ্জ: সরকারের সরাসরি পক্ষাবলম্বনের কারণে গণভোটের ফলাফল ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা: ভোটার উপস্থিতি কম হলে বা সরকারি প্রচারণার বিপরীতে ফল এলে তা সরকারের নৈতিক অবস্থানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন যে, এই প্রচারণায় কোনো আইনি বাধা নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আইনি বৈধতা থাকলেও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের ভূমিকা আরও নির্লিপ্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল।