জন্মের পর থেকেই দুটি হাত নেই। দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে বড় হওয়া এক তরুণী। যে মেয়েকে একসময় পরিবার ও সমাজের অনেকেই বোঝা মনে করেছিল, সেই আয়েশা আক্তার আজ বাংলাদেশের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রতীক। পা দিয়ে লিখে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে সম্প্রতি মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের এই তরুণী।
আয়েশার দীর্ঘ সংগ্রাম, অশ্রু, বঞ্চনা ও সাফল্যের কাহিনি নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্য তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’ এখন দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশের এই অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প এবার প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোস্তফা মল্লিকের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় নির্মিত ২৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই তথ্যচিত্রটি গত ১৭ মে চ্যানেল আইয়ে প্রচারের পর ব্যাপক সাড়া ফেলে। শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক Faridur Reza Sagar–এর প্রযোজনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের অনুমোদনও পেয়েছে।
চীনে অনুবাদ ও প্রদর্শনের উদ্যোগ
আয়েশার জীবনসংগ্রামের গল্পে মুগ্ধ হয়ে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন চীনের খ্যাতিমান ফটোগ্রাফার, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশপ্রেমী Liu Jie। তিনি ইতোমধ্যে ‘পায়ের ছাপ’ তথ্যচিত্রের চীনা ভাষায় অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন।
লিউ জিই আয়েশার সংগ্রামকে চীনের আশির দশকের কিংবদন্তি শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী Zhang Haidi–এর জীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। চীনে ঝাং হাইদির জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
তিনি জানিয়েছেন, আগামী মাসে চীনের দুটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়—South China Normal University এবং South China Agricultural University–এ তথ্যচিত্রটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দুটির গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষকদের মতে, আয়েশার জীবনগাথা ইতোমধ্যে চীনের বুদ্ধিজীবী, গবেষক ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তিনটি স্কুলেও প্রদর্শন
চীনা গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী জু দির সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশটির তিনটি উচ্চবিদ্যালয়েও তথ্যচিত্রটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে।
উদ্যোক্তারা মনে করছেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতা জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এই গল্প চীনের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
তাঁদের ভাষ্য, আয়েশার জীবন শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়; এটি মানবিক সাহস, শিক্ষা এবং আত্মবিশ্বাসের শক্তির এক বাস্তব দলিল।
স্কুলে ভর্তি নিয়েও ছিল সংগ্রাম
‘পায়ের ছাপ’ তথ্যচিত্রে আয়েশার জীবনের এমন সব অধ্যায় উঠে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অবিশ্বাস্য।
জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকায় শৈশবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁকে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় এক শিক্ষকের উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি।
শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। অন্যরা হাতে লিখলেও আয়েশাকে পা দিয়ে লেখা শিখতে হয়েছে। প্রতিদিনের পড়াশোনা, পরীক্ষা, চলাফেরা—সবকিছুই ছিল তাঁর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জের।
তবু থেমে যাননি তিনি।
২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁর জীবন নতুন মোড় নেয়।
একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর বদলে যায় জীবন
চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোস্তফা মল্লিক আয়েশাকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করলে তা দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে।
এরপর প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসার সুযোগ পান আয়েশা। তিনি ‘কিংবদন্তি অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন এবং দুই লাখ টাকার অনুদান পান।
এই অর্থ দিয়ে তাঁদের জরাজীর্ণ টিনের ঘরটি সংস্কার করে পাকা বাড়িতে রূপান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে ফ্রান্সপ্রবাসী এক ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান তিনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০২৫ সালে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
‘আয়েশা পুরো জাতির জন্য অনুপ্রেরণা’
আয়েশার সাফল্য দেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিশিষ্টজনদেরও মুগ্ধ করেছে।
ABM Harun Ur Rashid, Syed Mahfuzul Aziz, Omar Sadat এবং Abdullah Al Mamun তাঁকে জাতীয় অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশিষ্ট কৃষি সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব Shaikh Siraj বলেন,
“শহরের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আর প্রত্যন্ত গ্রামের হাতহীন আয়েশার ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সে অনেকের জন্য চোখ খুলে দেওয়ার মতো উদাহরণ।”
চাকরির অপেক্ষায়, তবু বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের পড়াচ্ছেন
মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর বর্তমানে আয়েশা চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে নিজের সংগ্রামের কথা ভুলে যাননি।
নিজ গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের তিনি সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে পড়াচ্ছেন। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিয়মিত সময় দিচ্ছেন তাঁদের জন্য।
তবে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও একটি স্থায়ী চাকরির প্রত্যাশা এখনো তাঁর জীবনের বাস্তবতা।
পাশে দাঁড়িয়েছে চ্যানেল আই
তথ্যচিত্রটি প্রচারের পর আয়েশার প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়েছে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ।
চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ঘোষণা দিয়েছেন, স্থায়ী চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত আয়েশাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সম্মানী বা জীবনধারণ সহায়তা দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে তথ্যচিত্রের পরিচালক মোস্তফা মল্লিক বলেন,
“এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমি আয়েশার জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর প্রতিটি লড়াই, প্রতিটি সাফল্যের সাক্ষী আমি। চ্যানেল আই আমাকে এই বায়োডকুমেন্টারি নির্মাণের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। আয়েশা প্রমাণ করেছে—জীবনকে জয় করতে হাত লাগে না, প্রয়োজন অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস।”
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অনুপ্রেরণা
প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক তরুণীর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প ‘পায়ের ছাপ’ এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠছে।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে প্রদর্শনের উদ্যোগ সেই স্বীকৃতিকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে। আয়েশা আক্তারের জীবনগাথা প্রমাণ করছে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের স্বপ্ন, অধ্যবসায় ও অদম্য মানসিক শক্তিই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের পথ তৈরি করে।