ঢাকা

ছেলের স্ত্রীকে দেওয়া রাজকীয় উপাধি কেড়ে নিলেন ব্রুনেইয়ের সুলতান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট

ব্রুনেইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ তাঁর এক পুত্রবধূর সব রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করেছেন। রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর আচরণ ‘অশোভন’ এবং সুলতানের প্রতি ‘অসম্মানজনক’ ছিল—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের আচরণের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

চলতি মাসের শুরুতে ব্রুনেই দারুসসালামের গ্র্যান্ড চেম্বারলেইনের কার্যালয় এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে। এতে বলা হয়, সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহর আদেশে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, পেঙ্গিরান রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ সুলতানের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং রাজপরিবারের একজন সদস্যের স্ত্রী হিসেবে ‘অনুপযুক্ত আচরণ’ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড রাজপরিবারের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

৩৩ বছর বয়সী রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ ব্রুনেইয়ের প্রিন্স আবদুল মালিকের স্ত্রী। ৪৩ বছর বয়সী আবদুল মালিক সিংহাসনের উত্তরাধিকারক্রমে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। রাজপরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সদস্যের স্ত্রী হিসেবে রাবিয়াতুল এতদিন একটি বিশেষ রাজকীয় মর্যাদা ও উপাধি ভোগ করে আসছিলেন।

তাঁর সেই রাজকীয় উপাধি ছিল ‘ইয়াং আমাত মুলিয়া পেঙ্গিরান আনাক ইস্তেরি’। সুলতানের আদেশে এখন সেই উপাধিও বাতিল করা হয়েছে।

ঠিক কী করেছিলেন রাবিয়াতুল, জানা যায়নি

রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি প্রকাশ্যে এলেও এর পেছনের সুনির্দিষ্ট ঘটনা এখনো রহস্যের মধ্যেই রয়েছে।

ব্রুনেইয়ের গ্র্যান্ড চেম্বারলেইনের কার্যালয়ের বিবৃতিতে রাবিয়াতুলের আচরণকে সুলতানের প্রতি অসম্মানজনক এবং রাজপরিবারের একজন সদস্যের স্ত্রী হিসেবে অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি ঠিক কী করেছিলেন, কখন করেছিলেন কিংবা তাঁর কোন কর্মকাণ্ডকে রাজপরিবারের মর্যাদাহানিকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে—এসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিবি নিউজও জানিয়েছে, রাবিয়াতুলের কর্মকাণ্ডে সুলতানের প্রতি অসম্মান প্রকাশ পেয়েছে এবং এতে রাজতন্ত্রের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তারাও ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।

ফলে রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহারের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাবিয়াতুল ও প্রিন্স আবদুল মালিকের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে—এমন কোনো ঘোষণাও ব্রুনেইয়ের রাজপরিবার বা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, উপাধি হারালেও তিনি এখনো প্রিন্স আবদুল মালিকের স্ত্রী এবং সেই সূত্রে রাজপরিবারের একজন সদস্য।

বিবাহবিচ্ছেদের কারণে নয়, এবার উপাধি হারালেন পুত্রবধূ

সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ অতীতেও রাজপরিবারের সদস্যদের রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করেছেন। তবে সেসব ঘটনার সঙ্গে এবারের ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

২০০৩ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়াম আবদুল আজিজের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর সুলতান তাঁর সাবেক স্ত্রীর সব রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করেন।

এরপর ২০১০ সালে তৃতীয় স্ত্রী আজরিনাজ মাজহার হাকিমের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হলে তাঁর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু রাবিয়াতুলের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের কোনো তথ্য নেই। তিনি সুলতানের ছেলের স্ত্রী হিসেবেই রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত আছেন। ফলে একজন বর্তমান পুত্রবধূর রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহারের ঘটনা ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী।

এই সিদ্ধান্তের ফলে তাঁর ব্যক্তিগত রাজকীয় মর্যাদা কমেছে কি না কিংবা রাজপরিবারের অন্যান্য আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে তাঁর অবস্থান কী হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

১০ দিন ধরে চলেছিল তাঁদের রাজকীয় বিয়ে

প্রিন্স আবদুল মালিক ও রাবিয়াতুল আদাউইয়াহর বিয়ে ছিল ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন।

২০১৫ সালে রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানের রাজপ্রাসাদে তাঁদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা চলে টানা ১০ দিন ধরে। এতে দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক অতিথি অংশ নেন।

এই দম্পতির চার সন্তান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রিন্সেস মুথিয়ার বয়স ১০ বছর, প্রিন্সেস ফাতিয়্যাহর বয়স ৮ বছর, প্রিন্সেস খালিশাহর বয়স ৬ বছর এবং সবচেয়ে ছোট প্রিন্সেস নাবিলাহর বয়স ১৬ মাস।

মায়ের রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করা হলেও সন্তানদের রাজকীয় উপাধিতে এর কোনো প্রভাব পড়েনি বলে প্রতিবেদনগুলোতে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, রাবিয়াতুলের উপাধি বাতিলের সিদ্ধান্ত তাঁর সন্তানদের রাজপরিবারের মর্যাদা থেকে সরিয়ে দেয়নি।

প্রিন্স আবদুল মালিক সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর প্রথম স্ত্রী রানি সালেহার সন্তান। তিন স্ত্রীর ঘরে সুলতানের মোট ১২ সন্তান রয়েছে।

দীর্ঘ রাজত্বে সুলতানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ

৮০ বছর বয়সী হাসানাল বলকিয়াহ ব্রুনেইয়ের একক শাসক। ১৯৬৮ সালে তিনি দেশটির ২৯তম সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন। এরপর প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি দেশটির শাসন পরিচালনা করছেন।

দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এই শাসক বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সিংহাসনে থাকা রাজা বা শাসকদের একজন এবং বর্তমানে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে শাসনরত জীবিত রাজা হিসেবে পরিচিত।

তাঁর সরকারি বাসভবন ইস্তানা নুরুল ইমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসিক প্রাসাদগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশাল এই প্রাসাদে রয়েছে ১ হাজার ৭৮৮টি কক্ষ।

4
তেলসমৃদ্ধ ব্রুনেইয়ের রাজতন্ত্র

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে অবস্থিত ছোট দেশ ব্রুনেই চারদিকে মালয়েশিয়ার ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত। আয়তনে ছোট হলেও দেশটি বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদের কারণে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।

হাসানাল বলকিয়াহর দীর্ঘ শাসনামলে তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ব্রুনেই তার সমৃদ্ধ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজপরিবার এবং সুলতানের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক।

এই ব্যবস্থায় রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত আচরণ ও জনসম্মুখে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর প্রত্যাশা রয়েছে। ফলে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে রাজপরিবারের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।

রাবিয়াতুল আদাউইয়াহর ক্ষেত্রে সুলতানের সর্বশেষ সিদ্ধান্তও সেই কঠোর রাজকীয় কাঠামোরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স