আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে প্রথম আলোর বন্ধুসভা আয়োজিত ‘আন্তবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) বিতর্ক দল ‘বুটেক্সডিসি বুনন’। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটিকে পরাজিত করে শিরোপা অর্জন করেছে দলটি।
বিতর্কের পাশাপাশি দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল তরুণদের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ প্যানেল আলোচনা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন তরুণদের যুক্তিনির্ভর চিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গঠনমূলক বিতর্কের সুযোগ তৈরি করে।
গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ প্রতিযোগিতা ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আট দল থেকে ফাইনালে দুই
সংসদীয় ধারার এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি দল অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার প্রথম পর্বে মুখোমুখি হয় দলগুলো। সেখান থেকে চারটি দল পরবর্তী পর্বে উন্নীত হয়।
পরবর্তী পর্বের বিতর্ক শেষে বিজয়ী দুটি দল জায়গা করে নেয় চূড়ান্ত পর্বে। ফাইনালে মুখোমুখি হয় বুটেক্সের ‘বুটেক্সডিসি বুনন’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি।
চূড়ান্ত বিতর্কে যুক্তি, বক্তব্য উপস্থাপন, পাল্টা যুক্তি ও দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে যায় বুটেক্সের দল। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ‘বুটেক্সডিসি বুনন’।
ফাইনালের শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক নির্বাচিত হয়েছেন বুটেক্স দলের সদস্য মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
যাঁরা চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য
চ্যাম্পিয়ন বুটেক্স দলের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম ব্যাচের তিন শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন—
ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাহমুদুল হাসান
অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাদ আল আশরাফি
ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম
তিনজনের সমন্বিত দলীয় প্রচেষ্টায় আসে প্রতিযোগিতার শিরোপা। এর পাশাপাশি ফাইনালে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ বিতার্কিকের পুরস্কারও পান মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
প্রথম সাফল্যেই শিরোপা
বুটেক্স ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, ২০২৬-২৭ কার্যনির্বাহী কমিটির এটি প্রথম সাফল্য। বড় একটি মঞ্চে বুটেক্সকে তুলে ধরতে পারা এবং প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কে ক্লাবটির জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে পারায় তিনি গর্বিত।
তাঁর মতে, এই বিজয় শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফল নয়; এটি নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্লাবের কার্যক্রমের জন্যও একটি ইতিবাচক সূচনা।
ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাদ আল আশরাফি বলেন, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করে বিজয় অর্জন করা সব সময়ই গর্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়। এই সাফল্য শুধু তিনজন বিতার্কিকের নয়; এর সঙ্গে ক্লাবের সদস্য, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সবার অবদান রয়েছে।
ফাইনালের শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, বুটেক্সডিসির জন্য কিছু করতে পারা তাঁর জন্য অনন্য অনুভূতি। জাতীয় পর্যায়ে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করা অত্যন্ত গর্বের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তরুণদের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা
বিতর্ক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘আগামীর বাংলাদেশ: তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা।
আলোচনায় তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব, সামাজিক অংশগ্রহণ, অভিবাসন, নাগরিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের হেড অব কমিউনিকেশন্স মো. আবদুল কাইয়ুম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চাইল্ড অ্যান্ড ইয়ুথ লিডারশিপের অ্যাডভাইজার ফারজুনী রেজা, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, ব্র্যাকের ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম ও মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. আবদুল কাদির এবং এঞ্জেলস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বেনজীর আরাফা।
আলোচনা সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভার বিতর্ক ও অনুষ্ঠান সম্পাদক এস এম কামরুল ইসলাম।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত এই আলোচনায় বক্তারা শিক্ষা ও দক্ষতার সমন্বয়, কর্মক্ষেত্রে তরুণদের প্রস্তুতি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে তরুণদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যুক্তিনির্ভর সমাজ গঠনে বিতর্কের ভূমিকা
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিতর্ক শুধু প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়; বরং যুক্তি বিশ্লেষণ, তথ্য যাচাই, বক্তব্য উপস্থাপন, ভিন্নমতকে বোঝা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দক্ষতা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সংসদীয় ধারার বিতর্কে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়। ফলে বিতার্কিকদের একই সঙ্গে বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ, প্রতিপক্ষের যুক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা বক্তব্য দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।
আন্তবিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এমন প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের সেই দক্ষতাগুলো আরও বড় পরিসরে প্রয়োগের সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই মঞ্চে অংশ নেওয়ায় পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও চিন্তার বিনিময়েরও সুযোগ তৈরি হয়।
সম্মাননা পেলেন বিতার্কিক ও বিচারকেরা
প্রতিযোগিতার সমাপনী পর্বে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া বিতার্কিক এবং বিচারকদের সম্মাননা দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ওঠা দুই দলের বিতার্কিকদের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি দেওয়া হয় এ পর্বে।
চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বুটেক্সডিসি বুননের সাফল্য এবং ফাইনালের শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক হিসেবে মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের স্বীকৃতি বুটেক্স ডিবেটিং ক্লাবের জন্য এবারের আয়োজনকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক যুব দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও প্যানেল আলোচনা তাই একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও নেতৃত্বের চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, অন্যদিকে আগামীর বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনারও সুযোগ করে দিয়েছে।
আর সেই আয়োজনের প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে সেরা হয়ে বুটেক্সডিসি বুনন দেখিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিতর্কচর্চা শুধু আত্মবিশ্বাস ও বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতাই বাড়ায় না—জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতাও তৈরি করে।