ঢাকা

বিশ্বে ষষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশের গর্ব, এশিয়ায় শীর্ষে গ্রিন ইউনিভার্সিটির মার্স রোভার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
একটি স্বপ্ন, কয়েকজন তরুণের সাহস, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়ার মানসিকতা—এই চার শক্তির সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক স্পেস রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পতাকা উজ্জ্বল করেছে গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (জিইউবি) মার্স রোভার টিম।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্পেস রোবোটিকস প্রতিযোগিতা ‘অ্যানাটোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (এআরসি) ২০২৬’-এ অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির দল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় ২০টি ফাইনালিস্ট দলের মধ্যে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছে জিইউবি মার্স রোভার টিম। একই সঙ্গে এশিয়া থেকে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করেছে বাংলাদেশি এই দল।

শুধু ফলাফলেই নয়, প্রতিযোগিতার কঠিন পরিস্থিতিতে দলটির দৃঢ়তা, দ্রুত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, অধ্যবসায় এবং পারস্পরিক সমন্বয়ও পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এসব গুণের স্বীকৃতি হিসেবে দলটি অর্জন করেছে মর্যাদাপূর্ণ ‘মোস্ট রেজিলিয়েন্ট টিম’ সম্মাননা।

২৯ জুলাই থেকে ১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হয় এআরসি ২০২৬। শুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪০টির বেশি দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কয়েক ধাপের কঠোর বাছাই ও মূল্যায়নের পর ফাইনালের জন্য নির্বাচিত হয় মাত্র ২০টি দল। সেই কঠিন প্রতিযোগিতায় বিশ্বসেরা দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করে ষষ্ঠ স্থান অর্জন এবং এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে প্রথম হওয়া বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক রোবোটিকস গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, তবু থামেনি লড়াই

আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পথটি জিইউবি মার্স রোভার টিমের জন্য সহজ ছিল না। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে দলের প্রস্তুতির জন্য হাতে ছিল সীমিত সময়। এর মধ্যেই রোভার, সফটওয়্যার, মেকানিক্যাল সিস্টেম, ইলেকট্রনিকস ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রস্তুতি শেষ করতে হয়।

সহ-উপাচার্য অধ্যাপক খাজা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ বলেন, শেষ মুহূর্তে ভিসা পাওয়া, সীমিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া এবং নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও শিক্ষার্থীরা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

তাঁর মতে, দৃঢ় সংকল্প, অধ্যবসায় ও দলগত প্রচেষ্টা থাকলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারে।

প্রতিযোগিতার মাঠেও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে দলটিকে। প্রযুক্তিগত সমস্যা, সময়ের চাপ এবং প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপের জটিলতা সামলে দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমস্যার কার্যকর সমাধান বের করাই হয়ে ওঠে সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।

এই কারণেই ‘মোস্ট রেজিলিয়েন্ট টিম’ পুরস্কারটি দলটির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ এটি শুধু রোভারটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার স্বীকৃতি নয়; প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটির টিকে থাকা, সমস্যা মোকাবিলা এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতারও স্বীকৃতি।

ছয় শিক্ষার্থীর কাঁধে ছিল বড় দায়িত্ব

তুরস্কে অনুষ্ঠিত মূল প্রতিযোগিতায় জিইউবি মার্স রোভার টিমের হয়ে মাঠে ছিলেন ছয় শিক্ষার্থী। তাঁরা দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের নেতৃত্ব দেন।

স্টুডেন্ট টিম লিড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রেজওয়ান ইনতেসার। ব্যবস্থাপনা উপদলের নেতৃত্বে ছিলেন শাহরিয়ার বিন সালাম।

প্রযুক্তিগত বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন সফটওয়্যার অ্যান্ড অটোনমাস সাব-টিম লিড ময়নুল হাসান জিশান, মেকানিক্যাল ডিজাইন সাব-টিম লিড বিবেক দত্ত সর্গ, মেকানিক্যাল ফ্যাব্রিকেশন সাব-টিম লিড বিশাল দত্ত স্বপ্ন এবং ইলেকট্রিক্যাল সাব-টিম লিড মো. শাহরিয়ার মাহমুদ।

তবে প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নেওয়া ছয়জনের পাশাপাশি বাংলাদেশে থেকে দলের প্রস্তুতি ও বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অন্য সদস্যরাও। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মিডিয়া অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং সাব-টিম লিড সাফি আলম এবং সায়েন্স সাব-টিম লিড মোছা. আফরিন আক্তার ইমাসহ দলের অন্যান্য সদস্য।

একটি রোবোটিকস দলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে যেসব বিভাগ একসঙ্গে কাজ করে, জিইউবি দলের মধ্যেও সেই সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। রোবটের নকশা থেকে শুরু করে যান্ত্রিক কাঠামো তৈরি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা এবং প্রচার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণদের সক্ষমতার প্রদর্শন

জিইউবি মার্স রোভার টিমের এই সাফল্য শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতামূলক অর্জন নয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্পেস রোবোটিকসের মতো উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতাও নতুন করে সামনে এসেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের দলগুলোর সঙ্গে একই মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এশিয়ার সেরা দল হওয়া বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোনমাস সিস্টেম, মেকাট্রনিকস ও মহাকাশপ্রযুক্তির মতো দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও সক্ষমতা যে ক্রমেই বাড়ছে, এই অর্জন তারই একটি উদাহরণ।

গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন এই অর্জনকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পুরো বাংলাদেশের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্পেস রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় বিশ্বে ষষ্ঠ স্থান অর্জন, এশিয়ার সেরা দল হিসেবে স্বীকৃতি এবং ‘মোস্ট রেজিলিয়েন্ট টিম’ সম্মাননা পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধা, অধ্যবসায় ও উদ্ভাবনী শক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

উপাচার্যের মতে, সঠিক দিকনির্দেশনা, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং নিরলস পরিশ্রম থাকলে বাংলাদেশের তরুণরাও বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

তিনি দলের প্রত্যেক সদস্য, উপদেষ্টা, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানান।

শুধু রোবট তৈরি নয়, গবেষণার সংস্কৃতিরও প্রতিফলন

মার্স রোভার তৈরির মতো প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীদের একক কাজ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিকস, মেকানিক্যাল ডিজাইন, ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়।

ফলে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব প্রকল্পে প্রয়োগের সুযোগ পান। একটি রোবটকে বাস্তবে পরিচালনাযোগ্য করে তুলতে গিয়ে তাঁদের নকশা, নির্মাণ, প্রোগ্রামিং, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা অর্জন করতে হয়।

জিইউবি দলের এবারের অর্জন সেই ব্যবহারিক ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রোবোটিকস ও মহাকাশপ্রযুক্তি নিয়ে কাজের পরিসর আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

আন্তর্জাতিক সাফল্যের নতুন দিগন্ত

অ্যানাটোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এ বিশ্বে ষষ্ঠ এবং এশিয়ায় প্রথম হওয়া জিইউবি মার্স রোভার টিমের জন্য নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটির প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘মোস্ট রেজিলিয়েন্ট টিম’ সম্মাননার মাধ্যমে।

ভিসা জটিলতা, প্রস্তুতির জন্য সীমিত সময় এবং প্রতিযোগিতার মাঠের নানা চ্যালেঞ্জ—সবকিছুকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের এই তরুণেরা প্রমাণ করেছেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় সাফল্যের জন্য শুধু অত্যাধুনিক সরঞ্জামই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, দলগত সমন্বয়, সৃজনশীলতা এবং ব্যর্থতার পরও আবার উঠে দাঁড়ানোর মানসিকতা।

এবারের অর্জন তাই জিইউবির মার্স রোভার দলের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের রোবোটিকস ও স্পেস-টেক গবেষণার জন্যও একটি অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত। সামনে আরও বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হলে এ ধরনের উদ্যোগ থেকেই বাংলাদেশের তরুণদের জন্য মহাকাশ ও উচ্চপ্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স