জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জনমত গঠন ও দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান।
তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা
সংসদে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকার বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, “জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।”
তিস্তা নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবহার, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলা এবং কৃষির উন্নয়নে এ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরি হবে।
‘জীবনবান্ধব বাজেট’ হিসেবে উল্লেখ
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সর্বোচ্চ বিবেক, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে এমন একটি বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি আনতে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনা শেষে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা পর্ব শেষ হয়।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১টি পণ্যের ওপর কর প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের প্রতি সরকারের যে দায়িত্ব, তার কিছুটা হলেও পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের পাশাপাশি কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বক্তব্যে কৃষকদের ঋণ মওকুফ, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং প্রবাসী কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বাজেটের তিন প্রধান লক্ষ্য
নিজ সরকারের বাজেটের মূল লক্ষ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে কয়েকজন সুবিধাভোগীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেটে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
১. দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা;
২. অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা;
৩. বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতি বাড়ানো।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তিন ধাপের পরিকল্পনা
দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপে কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রথম ধাপে অর্থনীতির অবনতি ঠেকানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হবে।
তৃতীয় ধাপে উৎপাদনশীল, উদ্ভাবননির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে তরুণদের চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না; বরং মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।
সৃজনশীল অর্থনীতিতে গুরুত্ব
চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত ও খেলাধুলাকে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।
‘সংকটকে অজুহাত বানানো হবে না’
বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার এবং ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, বড় কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যেগুলো এখন দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, “এই সংকট আছে। আমরা সংকটকে অস্বীকার করতে চাই না। আবার সংকটকে অজুহাতও বানাতে চাই না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে আমরা সংকট মোকাবিলা করব।”
তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের দর্শন হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় লক্ষ্য হলো ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের উদ্যোগ
ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৩টি দেশের সঙ্গে ২৩টি ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্পদ ফেরানোর লক্ষ্যে ৬০টির বেশি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়েছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
জ্বালানি খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা
জ্বালানি খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এ খাতে দুর্নীতি ও ভুল পরিকল্পনার প্রভাব ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, উদ্দেশ্যমূলক চুক্তি এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে অবহেলা করে বিদেশি কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ
জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা শুধু সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাইবার সক্ষমতাও যুক্ত।
তিনি বলেন, সরকার আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে কাজ করা হচ্ছে।
জাতীয় ইস্যুতে বিরোধীদের সহযোগিতা চাইলেন
বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদ, সংবিধান সংশোধনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণই দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করবে।
দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই সরকার, এই সংসদ জনগণের। আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করি। জনগণের কষ্ট আমরা বুঝি। জনগণের সম্পদ রক্ষাকে আমরা পবিত্র দায়িত্ব মনে করি।”
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে উন্নয়ন হবে ন্যায্যতাভিত্তিক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।