রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি আরও তীব্র হয়েছে। ইরান বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, সামরিক শক্তি কিংবা রাজনৈতিক বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে পরাজয় স্বীকার করতে হবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘অত্যন্ত নিকৃষ্ট’ দেশ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তিনি মার্কিন নাগরিকদের এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়। একই সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘টুইট করে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে না’
শনিবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি কখন খোলা হবে আর কখন বন্ধ থাকবে, সেটি ইরানই নির্ধারণ করবে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না ‘পরাজয়ের বাস্তবতা’ মেনে নিচ্ছে এবং ‘অবাস্তব কল্পনা’ থেকে বেরিয়ে আসছে, ততক্ষণ হরমুজের অবরোধ বহাল থাকবে।
ইরানের এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আরও বলেন, একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, বিমানবাহী রণতরি, কোনো সামরিক আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে এবং জলপথটির নিয়ন্ত্রণকে সম্ভাব্য আলোচনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
আলোচনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এলেও ইরান জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা পুনরায় শুরু করার কোনো সিদ্ধান্ত তারা এখনো নেয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন। ইরানের সংবাদমাধ্যম শাহরারা নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আরাগচি একই সঙ্গে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নির্ধারিত কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে।
অর্থাৎ যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হলেও হরমুজের অবরোধ প্রত্যাহারকে ইরান আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল যায় হরমুজ দিয়ে
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান পথ হলো হরমুজ। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশও জ্বালানি সরবরাহের সংকটে পড়তে পারে।
হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন ও খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সংঘাতরত দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ২৯ শতাংশ বেড়েছে
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির জন্য কিছুটা বেশি দাম দিতে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, কোনো একটি ‘অত্যন্ত নিকৃষ্ট দেশ’ যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তার জন্য পেট্রোলের দাম কিছুটা বাড়া মেনে নেওয়া যেতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে ট্রাম্প যেসব কারণ উল্লেখ করছেন, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো তার অন্যতম।
তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ০৮ ডলার। এক বছর আগের তুলনায় এটি প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে জ্বালানির দাম কমানোর যে প্রতিশ্রুতি ছিল, যুদ্ধের বাস্তবতায় এখন তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে
জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে শুধু গাড়ির জ্বালানির খরচই বাড়ে না; এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতে পড়ে।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে শিল্পকারখানায়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটির মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতিকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তাদের যুক্তি হতে পারে—যে প্রশাসন জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেই প্রশাসনের আমলেই যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে
ইরান যুদ্ধের সামরিক ও কূটনৈতিক দিকের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানির দাম নিয়ে চাপও তত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সাধারণ ভোটারদের কাছে পেট্রোলের দাম একটি সরাসরি অনুভূত অর্থনৈতিক বিষয়। ফলে যুদ্ধের সামরিক ফলাফলের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক মূল্যও ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ
অন্যদিকে যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতিতেও ক্ষতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।
অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের অর্থনৈতিক মূল্য দুই দেশকেই দিতে হচ্ছে।
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি জ্বালানি সরবরাহ, পেট্রোলের দাম এবং মূল্যস্ফীতি।
এই বাস্তবতায় দুই দেশের সংঘাত শুধু সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বাণিজ্য, জ্বালানি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থার ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে।
হরমুজকে ঘিরে মুখোমুখি অবস্থান
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। তেহরান মনে করছে, এই জলপথের ওপর তাদের ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা রয়েছে এবং সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এই কারণে হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে ‘পরাজয়ের বাস্তবতা’ মেনে নিতে হবে। ওয়াশিংটন অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সামরিক শক্তিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে।
চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হরমুজ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে হরমুজ প্রণালি। ইরান জলপথটি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ছাড় চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবিতে অটল থাকতে চাইছে।
তাই সামরিক সংঘাত বন্ধ হলেও হরমুজের নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রশ্নে সমঝোতা না হলে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
এ মুহূর্তে ইরান যেমন সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ ধরে রাখছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
ফলে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখন শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নয়, বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।