দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারের চেয়ে ভালো কোনো পরিকল্পনা থাকলে তা রাজনৈতিক দলগুলোকে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভালো ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা পেলে সরকার তা গ্রহণ করবে এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। তবে সংকটকে কেন্দ্র করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য অপপ্রচার চালানো হলে সংশ্লিষ্টদের জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত দুস্থ, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের মধ্যে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।
সংকটের সমাধানে বিকল্প পরিকল্পনার আহ্বান
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করা কোনো রাজনীতিবিদের দায়িত্ব হতে পারে না। বরং একজন রাজনীতিবিদের দায়িত্ব হলো জনগণকে ধৈর্য ধরতে শেখানো, সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা এবং সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পথ দেখানো।
তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট নিয়ে যেসব রাজনৈতিক দল সরকারের সমালোচনা করছে, তাদের কাছে যদি সরকারের চেয়ে ভালো কোনো পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং সংসদে উপস্থাপন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যদি মনে করে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা দেশের জন্য ভালো, তাহলে সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সরকারের কোনো আপত্তি থাকবে না। প্রয়োজনে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই কাজ করা হবে।
অর্থাৎ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় না বানিয়ে সমাধানের জন্য কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাব দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
‘বিশৃঙ্খলার রাজনীতির দিন শেষ’
তারেক রহমান বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রাজনীতি করার দিন শেষ হয়ে গেছে। তাঁর অভিযোগ, মিথ্যাচার ও বিশৃঙ্খলার রাজনীতি অতীতে স্বৈরাচারী সরকার করেছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের কাছে উন্নয়ন ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তাই হঠকারিতা ও বিভ্রান্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জনমানুষের কল্যাণে বাস্তব পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাঙচুর করার রাজনীতির দিন এখন আর নেই। জনগণও এ ধরনের রাজনীতিকে সমর্থন করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত মানুষের সমস্যা সমাধানে মাঠে কাজ করা এবং বাস্তবসম্মত কর্মসূচি নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানো।
তিনি বলেন, জনগণের সামনে কোনো সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব থাকলে সেটি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। শুধু সমালোচনা বা অপপ্রচারের মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না।
‘সমালোচনা করা সহজ, কাজ করা কঠিন’
ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দলের প্রতিনিধিরা ওই এলাকার মানুষের সেবায় কাজ করছেন। একটি পাশের লেক পরিষ্কার করতেই ছয় মাস সময় লেগেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটা সহজ নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমালোচনা করা সহজ; কিন্তু মানুষের জন্য বাস্তবে কাজ করা কঠিন। তাই যারা শুধু সমালোচনায় ব্যস্ত, তাদের মাঠে নেমে মানুষের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে, সঠিক কথা বলতে হবে এবং এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে, যার কারণে সমাজে বা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের প্রসঙ্গ
বিএনপির নেতা-কর্মীদের দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা রাজপথে ছিলেন এবং বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বর্তমানে যারা বড় গলায় কথা বলছেন এবং মিথ্যাচার করছেন, তাঁদের অনেককে গত ১৭ বছর রাজপথে দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের বড় সংবাদপত্রগুলোর পুরোনো প্রতিবেদন দেখলেই বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন, গুম, হত্যা এবং মারধরের নানা ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে।
তাঁর বক্তব্যে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির ভূমিকা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়।
পুরোনো রাজনৈতিক ভুলের সমালোচনা
কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতারা ১৯৭১ সালে ভুল করেছেন, ১৯৮৬ সালে ভুল করেছেন, ১৯৯৬ সালেও ভুল করেছেন এবং ২০২৬ সালেও মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
তবে কোনো দলের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে তিনি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের উসকানিমূলক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কারও কাছে মানুষের উপকারে আসবে—এমন কোনো পরিকল্পনা থাকলে তা সংসদে উপস্থাপন করতে হবে এবং জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। সরকার যদি সেই পরিকল্পনাকে কার্যকর ও জনকল্যাণমূলক মনে করে, তাহলে তা বাস্তবায়নে কাজ করবে।
এভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা যেন শুধু বক্তব্য, আন্দোলন বা বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বিকল্প নীতি ও পরিকল্পনা উপস্থাপনের মাধ্যমে হয়—সেই বার্তাই দেন প্রধানমন্ত্রী।
জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা চায় প্রিয় মাতৃভূমি ধীরে ধীরে বিশ্বের বুকে এগিয়ে যাক।
এই লক্ষ্য অর্জনে দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে, শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করতে হবে। মানুষের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে।
তাঁর বক্তব্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল না রেখে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম মানবসম্পদে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হোক পরিকল্পনায়
গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি বিকল্প নীতি ও পরিকল্পনা উপস্থাপনের আহ্বান উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা থাকলে শুধু আন্দোলন বা প্রতিবাদের মাধ্যমে তা প্রকাশ না করে সমস্যার সমাধানে কার্যকর বিকল্প প্রস্তাবও দিতে হবে।
এতে রাজনৈতিক বিতর্কের ধরনও পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জনগণের সামনে বিভিন্ন দলের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক নীতি ও সেবা খাতের সংস্কার প্রস্তাব তুলনা করার সুযোগ তৈরি হলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও নীতিনির্ভর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকারের চেয়ে ভালো কোনো পরিকল্পনা এলে সেটি গ্রহণ করতে সরকার প্রস্তুত। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাজনৈতিক বিরোধিতার পাশাপাশি কার্যকর সমাধান উপস্থাপনের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে দুস্থ ও অসহায়দের সহায়তা
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুস্থ, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। পরে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক স্মরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ এবং ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধি আবদুর রহমান সানী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের কল্যাণে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সমাধানে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—সমালোচনা ও আন্দোলনের পাশাপাশি বিকল্প সমাধানও দিতে হবে; আর সেই সমাধান বাস্তবসম্মত হলে সরকার তা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে প্রস্তুত।