জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনার পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সর্বজনীন ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে তাঁর সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সমঝোতা সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক প্রতিনিধি, কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু), বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা মত ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা থাকলেও অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং সহনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বজনীন আচরণবিধি
সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ১৫ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
জকসুর দেওয়া এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সর্বজনীন ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে আচরণবিধিটি তৈরি করা হবে।
প্রস্তাবিত আচরণবিধি ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। এতে বিভিন্ন সংগঠনের কার্যক্রমের সীমা, পারস্পরিক আচরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিগুলো অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন সভা শেষে বলেন, জকসু সভাপতির উপস্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় এটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
‘মত ও সংগঠন যার যার, জবি পরিবার সবার’
উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিবেশ নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ‘মত ও সংগঠন যার যার, জবি পরিবার আমার, সবার’—এই চেতনা ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সংগঠনকে সৌহার্দ্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
তিনি বলেন, মত ও পথের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের উপস্থিতি থাকতেই পারে। কিন্তু ভিন্নমতের কারণে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করা বা সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
উপাচার্যের ভাষায়, ভিন্নমতের মধ্যেও অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোই সুন্দর ও সহাবস্থানমূলক ক্যাম্পাস সংস্কৃতির ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অবস্থান ভিন্ন হতে পারে এবং ভুল বা অসংগতির সমালোচনাও করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন ভাষা কিংবা কারও পারিবারিক পরিচয় তুলে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শালীনতার মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ করতে হবে।
৪ আগস্টের সংঘর্ষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা
সমঝোতা সভায় ৪ আগস্টের সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার পর ক্যাম্পাসে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা উদ্ভূত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সাংগঠনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একই ধরনের সংঘাত তৈরি না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এবং সব মত ও সংগঠনের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
কী ঘটেছিল ৪ আগস্ট
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে ওই অনুষ্ঠানে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রথমে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন, শহীদ মিনার এবং বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় কয়েক দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এতে জকসু ও ছাত্রশক্তির অন্তত ৫০ জন আহত হন। তাঁদের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও তাদের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হওয়ার দাবি করা হয়।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশেও অস্থিরতা তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
হাসপাতালে আহতদের ওপর হামলার অভিযোগ
সংঘর্ষের পর আহত ব্যক্তিরা চিকিৎসার জন্য ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে গেলে সেখানেও হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে পুলিশের পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সে করে আহত ব্যক্তিদের ওই হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
সব ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণ
সমঝোতা সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) প্রতিনিধি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্রশক্তি, খেলাফত ছাত্র মজলিস এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সামসুজ্জামান সুরুজ, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সভায় অংশ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিনা শরমীন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি মনজুর মোর্শেদ ভুঁইয়া, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন, প্রক্টর অধ্যাপক আজম খান এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক বিল্লাল হোসাইন।
সভায় ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আব্দুল মান্নান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক সহাবস্থানের নতুন কাঠামোর উদ্যোগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখা হবে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় একটি সর্বজনীন আচরণবিধি প্রণয়নের সিদ্ধান্তকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ, মতপ্রকাশ এবং পরস্পরের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি হলে ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে প্রশাসন।
তবে আচরণবিধি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সেটি প্রণয়নের সময় সব পক্ষের মতামত কতটা প্রতিফলিত হয় এবং পরে তা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে তার ওপর।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার সমন্বয়
সমঝোতা সভার আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ থাকা এবং একই সঙ্গে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশের জন্য দুটিই প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মনে করছে, রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন সংঘাত, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন বক্তব্য বা সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
এ কারণে প্রস্তাবিত ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ শুধু ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য রাজনৈতিক নির্দেশিকা নয়, বরং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের সংস্কৃতি তৈরির একটি কাঠামো হিসেবেও কাজ করতে পারে।
৪ আগস্টের সংঘর্ষের পর অনুষ্ঠিত এই সমঝোতা সভার মাধ্যমে আপাতত সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পথে যাওয়ার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নই হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষা। কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়িত হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।