আল–জাজিরা এক্সপ্লেইনার
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি ও রপ্তানিকেন্দ্রিক শিল্প কাঠামোর কারণে বাংলাদেশ এখন বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচির অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, রপ্তানি খাতে চাপ এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি বোঝা সামাল দিতে সরকার নতুন অর্থনৈতিক সহায়তা খুঁজছে।
বাংলাদেশ কী ধরনের সহায়তা চাইছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব কতটা গভীর হয়েছে এবং আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব বিষয় নিয়েই আল–জাজিরার বিশ্লেষণ।
আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের নতুন অনুরোধ
বাংলাদেশে আইএমএফের মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের কাছে নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচির অনুরোধ জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংস্থাটির কর্মকর্তারা অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করছেন।
ইভো ক্রজনার বলেন, “সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার করা এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে আইএমএফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তবে নতুন এই ঋণ সহায়তার পরিমাণ, শর্ত বা মেয়াদ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এর আগে গত মার্চে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা খোঁজা হচ্ছে।
যুদ্ধ কীভাবে চাপ তৈরি করেছে
জ্বালানি সংকট ও হরমুজ প্রণালি
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালায়। সংঘাত দ্রুত জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। যুদ্ধ শুরুর দিকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ আরোপ করে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এর বড় অংশ যেত এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যেখানে ৬৬ ডলারের আশপাশে ছিল, তা পরে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব
প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এই আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার কারণে জ্বালানির প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। ফলে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়কে সরাসরি বাড়িয়ে দেয়।
সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বেশির ভাগ সার কারখানায় উৎপাদন সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১৯ এপ্রিল দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
তৈরি পোশাক খাতে ধাক্কা
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও চাপে পড়েছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল আসে চীন থেকে এবং সেগুলোর পরিবহনপথের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর হয়ে পরিচালিত হয়।
যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব দেখা দিয়েছে।
পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ডেনিমের পরিচালক সাঈদ আহমেদ চৌধুরী ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস–কে বলেন, আগামী মৌসুমে ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর কিছু আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করায় জারা মালিক প্রতিষ্ঠান ইনডিটেক্সসহ বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের পোশাক চালান বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরে আটকা পড়ে।
কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার চাপ
বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্প খাতও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্লাস্টিক পণ্যের প্রধান কাঁচামাল রেজিনের দাম যুদ্ধের আগে প্রতি টন ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলারের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই খাতে।
বৈদেশিক ঋণের বাড়তি চাপ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিতে হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
লন্ডনভিত্তিক মার্কেট ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান আইএসআই-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে। আগের প্রান্তিকে তা ছিল ১১ হাজার ২২০ কোটি ডলার।
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সে সময় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই অবস্থান বদলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মেয়াদ চার বছর।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেন আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, দুই পক্ষ দ্রুত নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচি চালুর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
একই সময়ে বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা অনুমোদন দিয়েছে। জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
বৈশ্বিক ঋণসংকট কি আরও বাড়ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের আগেই বিশ্ব অর্থনীতি বৈদেশিক ঋণের বাড়তি চাপের মধ্যে ছিল। করোনা মহামারি, জলবায়ু দুর্যোগ, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বহু উন্নয়নশীল দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
শ্রীলঙ্কার উদাহরণ এখনো আলোচিত। ঋণসংকট ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে। পরে ২০২৩ সালে আইএমএফের কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের সহায়তা পায় দেশটি।
আইএমএফ গত এপ্রিলেই সতর্ক করে জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ আরও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় বৈশ্বিক ঋণচাপ আর কখনো দেখা যায়নি বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং রপ্তানি খাতকে সচল রাখা। অন্যথায় বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।