ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে প্রতিরক্ষাশিল্প–সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি নাগরিকদের দ্রুত কিয়েভ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে মস্কো। নতুন এই সতর্কবার্তা ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি অধিকৃত লুহানস্ক অঞ্চলের স্টারোবিলস্ক শহরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই কিয়েভে নতুন সামরিক অভিযান চালানো হবে। মস্কোর দাবি, ওই হামলায় শিক্ষার্থীদের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত লাগে এবং অন্তত ১৮ জন নিহত হন।
রাশিয়া এই ঘটনাকে “চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম” হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, এর প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন প্রস্তুত, প্রোগ্রামিং ও পরিচালনার সঙ্গে জড়িত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক হামলা চালানো হবে।
কিয়েভজুড়ে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কিয়েভ শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো হামলার তালিকায় রয়েছে। বিশেষ করে ড্রোন যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে যেসব কারখানা, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও প্রযুক্তিগত ইউনিট কাজ করছে, সেগুলোকে টার্গেট করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, হামলার সম্ভাব্য বিস্তৃত পরিসরের কারণে বিদেশি নাগরিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মী ও কূটনৈতিক মিশনের সদস্যদের শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
এ ছাড়া কিয়েভের সাধারণ নাগরিকদেরও সামরিক ও প্রশাসনিক স্থাপনার আশপাশে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাশিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এই প্রথমবারের মতো রাশিয়া এত স্পষ্ট ভাষায় কিয়েভে অবস্থানরত বিদেশিদের উদ্দেশে সরাসরি সতর্কবার্তা দিল।
স্টারোবিলস্ক হামলা ঘিরে উত্তেজনা
রাশিয়ার দাবি, গত সপ্তাহে অধিকৃত লুহানস্ক অঞ্চলের স্টারোবিলস্ক শহরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে শিক্ষার্থী ও বেসামরিক মানুষ অবস্থান করছিলেন। ওই ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে মস্কো।
ইউক্রেন এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন ড্রোন যুদ্ধকে এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্যতম কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। দীর্ঘপাল্লার ড্রোনের মাধ্যমে তারা রুশ ভূখণ্ডের ভেতরেও আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
রাশিয়া এসব হামলাকে “সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড” হিসেবে আখ্যা দিয়ে পাল্টা বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।
চার বছরের যুদ্ধে নতুন মাত্রা
চার বছর আগে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এরপর থেকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের চারটি অঞ্চল—লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করছে মস্কো।
তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এখনো এসব অঞ্চলকে ইউক্রেনের ভূখণ্ড হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে ড্রোন হামলা এখন সংঘাতের কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে সফল হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক কারখানা ও নগর অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রকেও অবহিত করেছে মস্কো
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে কিয়েভে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত করেছেন।
মস্কো দাবি করেছে, কিয়েভে থাকা মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদেরও সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে থেকেই সতর্ক করার মাধ্যমে রাশিয়া একদিকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক চাপ কমাতে চাইছে, অন্যদিকে হামলার দায় আন্তর্জাতিক পরিসরে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
নতুন করে আতঙ্কে কিয়েভ
রাশিয়ার ঘোষণার পর কিয়েভে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে রাজধানী শহরটি বহুবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হলেও সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্বাভাবিক করে তুলেছে।
কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা, যদি রাশিয়া সত্যিই ধারাবাহিক ও বড় আকারের হামলা শুরু করে, তাহলে তা শুধু ইউক্রেন নয়, গোটা ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও নতুন সংকটে ফেলতে পারে।
বিশেষ করে বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান যুদ্ধের বিস্তারের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।
সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
রাশিয়া যদি কিয়েভের ভেতরে প্রযুক্তিগত ও সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়, তাহলে ইউক্রেনও পাল্টা রাশিয়ার গভীরে আঘাত বাড়াতে পারে।
এতে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততার ঝুঁকিও বাড়বে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।