তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN)–এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ–১১০ (F110) জেট ইঞ্জিন বিক্রির পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রস্তাবটি কংগ্রেসের বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সফলভাবে অতিক্রম করেছে। নির্ধারিত ১৫ দিনের পর্যালোচনা সময়ের মধ্যে কংগ্রেস বিক্রি ঠেকাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এখন ইঞ্জিন বিক্রির প্রক্রিয়া পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয় নয়; বরং এটি ন্যাটো সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর টানাপোড়েনের পর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পুনরুজ্জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
কংগ্রেসের পর্যালোচনা শেষ, বাধা থাকল না
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত ২৪ জুন বিদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির নিয়ম অনুযায়ী তুরস্কের কাছে এফ–১১০ ইঞ্জিন বিক্রির প্রস্তাব কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠায়। ন্যাটোভুক্ত মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী কংগ্রেসের কাছে ১৫ দিনের পর্যালোচনার সুযোগ থাকে।
এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য বিক্রি স্থগিত করার উদ্দেশ্যে একটি যৌথ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই জমা দেওয়া ওই প্রস্তাবে তুরস্কের কাছে নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন আটকে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তাবটি কোনো কক্ষেই ভোটাভুটির জন্য তোলা হয়নি। ফলে ৯ জুলাই ১৫ দিনের পর্যালোচনা সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।
এরপর কী হবে?
কংগ্রেসীয় বাধা কাটিয়ে ওঠার পর এখন মার্কিন প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক (GE) এবং তুরস্কের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিস্তারিত কারিগরি ও বাণিজ্যিক আলোচনা শুরু হবে।
এই আলোচনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ইঞ্জিন সরবরাহের সময়সূচি;
যুদ্ধবিমানে ইঞ্জিন সংযোজন;
কারিগরি সমন্বয়;
বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা;
নিরাপত্তা ও উড্ডয়ন সনদ (সার্টিফিকেশন);
প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য হস্তান্তর।
কোন ইঞ্জিন ব্যবহার করবে ‘কান’?
তুরস্কের যুদ্ধবিমান কান–এ ব্যবহার করা হবে F110-GE-129E/F মডেলের জেট ইঞ্জিন।
চুক্তির আওতায় শুধু ইঞ্জিন সরবরাহই নয়, বরং—
ইঞ্জিন সংযোজন,
কাঠামোগত সমন্বয়,
প্রযুক্তিগত পরীক্ষা,
সনদ প্রদান,
রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা,
এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত তথ্য হস্তান্তরের ব্যবস্থাও থাকবে।
এগুলো যুদ্ধবিমানটির উন্নয়ন ও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৭৫ কোটি ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি
গত সপ্তাহে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের কাছে প্রায় ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের এফ–১১০ ইঞ্জিন বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
এই ইঞ্জিনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা জেনারেল ইলেকট্রিক তৈরি করে থাকে।
তুরস্কের দাবি, নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘কান’ হবে দেশটির প্রথম পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, যা ভবিষ্যতে তুর্কি বিমানবাহিনীর অন্যতম প্রধান যুদ্ধবিমান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
ট্রাম্প–এরদোয়ান বৈঠকের পর অগ্রগতি
ইঞ্জিন বিক্রির এই অগ্রগতি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের পর।
৭ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে এরদোয়ান জানান, ওয়াশিংটন তুরস্কের ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এফ–১১০ ইঞ্জিন বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়াও সেই কূটনৈতিক সমঝোতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
কেন আপত্তি তুলেছিলেন কংগ্রেসের কিছু সদস্য?
ইঞ্জিন বিক্রি আটকে দেওয়ার যৌথ প্রস্তাবে নয়জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা স্বাক্ষর করেছিলেন।
প্রস্তাবটির নেতৃত্ব দেন নেভাদা অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি দিনা টাইটাস।
তাঁকে সমর্থন জানান আরও কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য, যাঁদের মধ্যে ছিলেন—
ব্র্যাড শারম্যান
ক্রিস প্যাপাস
জিম ম্যাকগভার্ন
জিম কস্টা
জশ গটহেইমার
মাইক কুইগলি
জর্জ ল্যাটিমারসহ অন্যান্য আইনপ্রণেতা।
এঁদের অনেকেই অতীতেও তুরস্কের কাছে এফ–১৬ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির বিরোধিতা করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁদের অবস্থানের পেছনে মানবাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, গ্রিস ও আর্মেনিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্য-সংক্রান্ত ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এ ছাড়া যেসব নির্বাচনী এলাকা থেকে তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, সেখানে আর্মেনীয়, গ্রিক ও ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিও তাঁদের অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
ন্যাটো সম্পর্কের নতুন অধ্যায়?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার কাছ থেকে এস–৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর জেরে তুরস্ককে এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, কান যুদ্ধবিমানের জন্য এফ–১১০ ইঞ্জিন বিক্রির অগ্রগতি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন সহযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়, তবে এটি শুধু তুরস্কের নিজস্ব যুদ্ধবিমান কর্মসূচির জন্যই নয়, বরং ন্যাটোর দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র—যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের কৌশলগত সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।