‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা; ট্রেন ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ, হাজারো তরুণকে আটকের অভিযোগ, কঠোর অবস্থানে সুপ্রিম কোর্টের অসন্তোষ
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলন ঘিরে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে রাজধানী নয়াদিল্লি। আজ শনিবারের কর্মসূচি ঠেকাতে ট্রেন ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড স্থাপন, হোটেল ও ছাত্রাবাসে তল্লাশি এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। এমনকি শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সতর্ক করারও অভিযোগ উঠেছে।
আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে সরকারের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বলেছেন, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল ও নাগরিক জীবনে এমনভাবে বাধা সৃষ্টি করা যায় না। আদালত বিশেষ করে দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখা এবং টানা ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে আন্দোলনের আয়োজক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির। দক্ষিণ ভারতের অভিনেতা প্রকাশ রাজও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে দিল্লি পুলিশ শেষ পর্যন্ত তাঁদের রাজপথে নামতে দেবে কি না, নাকি কর্মসূচির আগেই গ্রেপ্তার করবে—তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দিল্লিতে পৌঁছানো ঠেকাতে বিভিন্ন রাজ্যে হাজার হাজার তরুণকে আটক করা হয়েছে। সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কার দাবি, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় দলটির প্রায় ১০ হাজার কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের আটকের খবর দিয়েছে। তবে আটকের সংখ্যা ও অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।
আন্দোলন ঠেকাতে রাজধানীজুড়ে কড়া নিরাপত্তা
‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের রাজধানীতে প্রবেশ ও কর্মসূচিস্থলে পৌঁছানো ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে আনা নিরাপত্তাকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আন্দোলন দমনে দিল্লি পুলিশের ২০ হাজার সদস্যের পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার সদস্য প্রস্তুত রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ কোম্পানি সশস্ত্র নারী পুলিশ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) সদস্যদেরও আনা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যাওয়ার জন্য দিল্লি ও আশপাশের রাজ্যগুলো থেকে কয়েক শ বাস রাজধানীতে আনা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টি স্টেডিয়াম চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রয়োজনে সেখানে আন্দোলনকারীদের একাধিক দিন আটকে রাখার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
যন্তর মন্তর এলাকায় গতকাল রাত ১০টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’ এবং সিজেপির আন্দোলনের সময়ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য, আন্দোলনকারীরা যাতে একত্র হতে না পারেন এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পৌঁছাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা। তবে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
ট্রেন ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ, প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের
আন্দোলনকারীদের দিল্লিতে আসা ঠেকাতে শনিবার ভোর চারটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ সময় নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে কোনো ট্রেন ছাড়বে না এবং এসব স্টেশনে কোনো ট্রেন আসবে না—এমন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
রেলস্টেশনগুলোতে বিশেষ পুলিশি নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। আশপাশের জেলা থেকে সিজেপির ডাকে কেউ যাতে দিল্লিতে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানার সঙ্গে দিল্লির সীমান্ত এলাকাতেও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল রাত নয়টার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাপভিত্তিক ভাড়ার গাড়ির চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি শুক্র ও শনিবার দিল্লির মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এসব পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বলেছেন, মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না। আন্দোলন ঠেকাতে মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখা কিংবা টানা ১০ ঘণ্টা রেল চলাচল বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতের বক্তব্য, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ অযথা ভোগান্তিতে না পড়েন। ট্রেন বা শহরের ভেতরে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হলেও জনসাধারণের অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ আন্দোলন ঘিরে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে প্রশাসনের দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি; অন্যদিকে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অতিরিক্তভাবে ব্যাহত করা উচিত নয়।
হোটেল, ছাত্রাবাস ও বাসাবাড়িতে নজরদারি
দিল্লিতে বাইরের রাজ্য থেকে আসা সম্ভাব্য আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করতে হোটেল, ছাত্রাবাস, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং পেইং গেস্ট হিসেবে থাকার বাড়িগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে হোটেল ও আবাসন পরিচালনাকারীদের সতর্ক করা হয়েছে, যাতে কম বয়সী বাইরের শিক্ষার্থীদের অবস্থানের বিষয়ে নজর রাখা হয়। রাজধানীর পাহাড়গঞ্জ এলাকার হোটেলমালিকদের দুই দিনের জন্য নতুন বুকিং না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু আবাসনকেন্দ্রেই নয়, বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের আন্দোলনে যোগ না দেওয়ার জন্য সতর্ক করার অভিযোগও উঠেছে। পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে কেউ যেন হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেন।
মসজিদে মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে মানুষকে ঘরে থাকার এবং আন্দোলনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পুলিশ মসজিদে গিয়ে এ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে—এমন দাবির পক্ষে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই এখানে পাওয়া যায়নি।
এসব পদক্ষেপের ফলে আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ হলেও, সেই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাভাবিক চলাচলের অধিকার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন রাজ্যে হাজারো তরুণকে আটকের অভিযোগ
দিল্লিতে পৌঁছানো ঠেকাতে বিভিন্ন রাজ্যে তরুণদের আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সিজেপি। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা দাবি করেছেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় প্রায় ১০ হাজার সিজেপি কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সদস্যরাও রয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাঙ্কা আটকের অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের আটক করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে এবং কেন আটক করা হচ্ছে, সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট তথ্য দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে গতকাল গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় বলেন, ‘আমরা যন্তর মন্তর অভিযান করবই, যা হয় হোক।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে তিনি আরও লেখেন, ‘আপনি আমাদের জেলে ঢোকান বা গুলি করুন, আমরা প্রস্তুত। আপনার মানসিক বিকারগ্রস্ত আচরণে আমরা পিছু হটব না।’
দিপকের অভিযোগ, তাঁদের অন্যতম মুখপাত্র দীপক বালিয়ান ও তাঁর ভাইকে রাজস্থান পুলিশ মারধর করেছে এবং আটকে রেখেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ধ্রুব রাঠি ও প্রকাশ রাজের সমর্থন
সিজেপির আন্দোলনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চলছে। জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি ১০ অক্টোবরের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ভারতে এসে ধ্রুব রাঠি বলেছেন, ‘এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।’
দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে ধ্রুব রাঠির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আলি রে আলি, জ্ঞানু, সময় শেষ; এবার তোমার যাওয়ার পালা।’
সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে ও অন্য নেতাদের পাশাপাশি এসব পরিচিত মুখের অংশগ্রহণের ঘোষণায় আন্দোলনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁদের কর্মসূচিস্থলে পৌঁছানো এবং সেখানে অংশ নিতে পারা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ রাজধানীতে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের আগেই আটক করা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা
আন্দোলন ঘিরে প্রশাসনের তৎপরতার আরেকটি দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রচারকারীদের ওপর নজরদারি। আন্দোলনকারীদের মতে, বড় সংবাদপত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তুলনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউবার এবং স্বতন্ত্র অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতারা এখন জনমত গঠনে বেশি প্রভাব ফেলছেন।
সিজেপির আগের যন্তর মন্তর কর্মসূচিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারের প্রভাব দেখা গিয়েছিল বলে আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। এবার সে ধরনের প্রচার নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বিশেষভাবে সক্রিয় হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রচারকারী ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র দৃশ্যমানভাবে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাইভ সম্প্রচার বা সংবাদ সংগ্রহের সময় পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিধিনিষেধ না মানলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে এসব বিধিনিষেধ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনস্থলে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হলে ঘটনাস্থলের তথ্য জনসাধারণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।
কৃষকনেতাদের সমর্থন, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
উত্তর প্রদেশের কয়েকজন কৃষকনেতা সিজেপির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁরা কর্মসূচিতেও যোগ দিতে পারেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কৃষকদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আন্দোলনটি শুধু সিজেপির দলীয় কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য সংগঠন ও সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে আরও বিস্তৃত হবে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। কৃষকনেতাদের সমর্থন আন্দোলনের পরিসর বাড়াতে পারে, যদিও তাঁদের অংশগ্রহণের মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনের নেত্রী নেহা বোরা সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে থাকা একজন কাপুরুষোচিত স্বৈরশাসকের অবস্থান এখন সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।’
তাঁর এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের প্রতিফলন। তবে সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে আন্দোলন ঘিরে নেওয়া সব পদক্ষেপের ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যায়নি।
পদত্যাগের দাবি ঘিরে অনিশ্চিত পরিস্থিতি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে যে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সরকারি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে; অন্যদিকে এর ব্যাপকতা সাধারণ মানুষের চলাচল ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণেও স্পষ্ট হয়েছে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের নামে এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষ অযথা দুর্ভোগে পড়েন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের আটকের অভিযোগ, রেল ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ এবং আবাসনকেন্দ্রে নজরদারির কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সিজেপির নেতারা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ধ্রুব রাঠি ও প্রকাশ রাজের সমর্থন আন্দোলনটির প্রচার বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ ও প্রশাসন আন্দোলনকারীদের রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ ঠেকাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।
এ অবস্থায় শনিবারের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, আন্দোলনকারীরা রাজপথে নামতে পারবেন কি না এবং তাঁদের আটক করা হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, তা ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।