ঢাকা

ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে নিয়োগের অভাব, শূন্য ৯৪ শতাংশ পদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
৬৪টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র চারজন; জনবলসংকট কাটিয়ে বিভাগীয় ল্যাবগুলো কার্যকর করার সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে তীব্র জনবলসংকট দেখা দিয়েছে। অধিদপ্তরটির অনুমোদিত ৬৪টি পদের মধ্যে ৬০টিই শূন্য। অর্থাৎ মোট পদের প্রায় ৯৪ শতাংশে কোনো জনবল নেই। এ পরিস্থিতিতে শূন্য পদ পূরণ এবং অধিদপ্তরের কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে অধিদপ্তরের জনবল, কার্যক্রম ও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিদপ্তরের নথিতে জনবলসংকটের পাশাপাশি যানবাহনের অভাব এবং নিজস্ব স্থাপনা না থাকাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুমোদিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্য দপ্তর থেকে কর্মকর্তা সংযুক্ত করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টের মতো বিশেষায়িত পদেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনবল নেই।

সংসদীয় কমিটির এক সদস্য বৈঠকে এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অপরাধীরা অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া সম্ভব। তাই এ অধিদপ্তরকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ঢাকার বাইরের বিভাগীয় ল্যাবরেটরিগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

৬৪টি পদের মধ্যে শূন্য ৬০টি

অধিদপ্তরের দেওয়া নথি অনুযায়ী, অনুমোদিত ৬৪টি পদের মধ্যে ৬০টি শূন্য রয়েছে। শূন্য পদগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯টি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ১৮টি ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টের পদ। মহাপরিচালক, পরিচালক, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালকের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্য দপ্তর থেকে কর্মকর্তা সংযুক্তির মাধ্যমে কাজ চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এই জনবলসংকটের কারণে অধিদপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিশেষায়িত পরীক্ষাগারের সক্ষমতা ধরে রাখা কতটা সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরীক্ষাগার-সংশ্লিষ্ট কারিগরি জনবলের ঘাটতি ডিএনএ পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রমে চাপ তৈরি করতে পারে।

অধিদপ্তরের নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাব এবং নিজস্ব স্থাপনা না থাকাও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। ফলে শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম-সুবিধা নিশ্চিত করাও অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকল্পের ৩৪ কর্মকর্তার নিয়োগ নিয়ে জটিলতা

ডিএনএ ল্যাবের একটি সূত্র জানায়, অধিদপ্তরের জনবলসংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে। অতীতে প্রকল্পের আওতায় কাজ করা ৩৪ কর্মকর্তা অধিদপ্তরে আত্তীকরণের দাবিতে আদালতে মামলা করেছিলেন। আদালত তাঁদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

এই নিয়োগ সম্পন্ন হলে ৩৪টি পদ পূরণ হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পদগুলো মূলত বিশেষায়িত হওয়ায় নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হলে অধিদপ্তরের জনবলসংকট কিছুটা কমতে পারে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগপর্যন্ত অনুমোদিত পদগুলোর বড় অংশই শূন্য থাকছে।

জনবলসংকটের পাশাপাশি যানবাহন ও স্থাপনার সীমাবদ্ধতা থাকায় নিয়োগের মাধ্যমে কতটা দ্রুত অধিদপ্তরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার ওপরও।

২০০৬ সালে দেশের প্রথম ডিএনএ ল্যাব প্রতিষ্ঠা

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রথম ডিএনএ পরীক্ষাগার ‘ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে গঠিত হয় ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের অধীন ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিটি ঢাকা মেডিকেল কলেজে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়া দেশের সাতটি বিভাগে রয়েছে ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরি।

বিভাগীয় এসব ল্যাবরেটরিতে মূলত নমুনা সংগ্রহ ও স্ক্রিনিং করা হয়। পরে সংগৃহীত নমুনা ঢাকার জাতীয় ল্যাবে পাঠানো হয়, যেখানে ডিএনএ প্রোফাইলিং সম্পন্ন করা হয়। ফলে বিভাগীয় পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ও প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ঢাকার কেন্দ্রীয় ল্যাবের সক্ষমতাও এ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিভাগীয় ল্যাবগুলো কার্যকর করার তাগিদ

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জনবলসংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধ তদন্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের গুরুত্ব বিবেচনায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অবহেলার সুযোগ নেই।

বিশেষ করে ঢাকার বাইরের বিভাগীয় ল্যাবগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ল্যাবের কার্যক্রম শক্তিশালী হলে বিভাগীয় পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ও স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বিভাগীয় ল্যাবগুলোর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল, যানবাহন, অবকাঠামো ও কারিগরি সক্ষমতা কতটা রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচার বাড়ানোর পরামর্শ

এদিকে একই বৈঠকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিটির এক সদস্য সম্প্রতি যশোরে মাইকিং করে বাল্যবিবাহের আয়োজন করার ঘটনা তুলে ধরেন। এমন আয়োজন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বাল্যবিবাহবিরোধী প্রচার আরও জোরদার করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন ওই সদস্য।

ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের জনবলসংকট নিরসন, বিভাগীয় ল্যাবগুলোর কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানোর বিষয়গুলো বৈঠকে গুরুত্ব পায়।

সম্পাদনা-সংক্রান্ত যাচাই: অধিদপ্তরের ৬৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৬০টি শূন্য থাকার তথ্য অনুযায়ী পূরণ করা পদের সংখ্যা চারটি। তবে কয়েকটি পদে অন্য দপ্তর থেকে কর্মকর্তা সংযুক্ত থাকায় তাঁদের অবস্থান ও অনুমোদিত পদের হিসাব মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত। একইভাবে আদালতের রায় এবং ৩৪ কর্মকর্তার নিয়োগপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স