ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদে বিরোধী দলকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটিতে আসনসংখ্যার অনুপাতে সভাপতির পদ দেওয়ার যে প্রস্তাব রয়েছে, সেটি এবার কতটা বাস্তবায়িত হবে—তা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
জাতীয় সংসদে বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৩৯টি—মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছেন সরকারি দল বা তাদের মিত্ররা।
আগামী ২৭ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। এই অধিবেশনে বাকি ৩৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করার কথা রয়েছে। তবে সরকারি ও বিরোধী দলের সূত্রগুলো বলছে, এসব কমিটির আর কোনো কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না দেওয়ার বিষয়টি। সরকারি দলের অবস্থান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল অংশ না নিলে সনদের অন্যান্য প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তাদের অংশগ্রহণকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করা উচিত নয়।
৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের পাওয়ার কথা ১৪টি
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ১৪টির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা। এর মধ্যে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে।
বিরোধী দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা এবার অন্তত ১১টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার আশা করেছিল। বিশেষ করে বিষয়ভিত্তিক আর কোনো কমিটির সভাপতি পদ না পেলেও সংসদে তাদের আসনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ১০টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হওয়ার প্রত্যাশা ছিল।
দ্বিতীয় অধিবেশনে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ায় তাদের এই প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত গঠিত মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত নয়টি কমিটির সব কটির সভাপতি হয়েছেন সরকারি দল বা তাদের মিত্রদের সদস্যরা।
সংসদীয় কমিটির গুরুত্ব কোথায়
জাতীয় সংসদের অন্যতম প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই দুই ক্ষেত্রেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে পারে। কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখার সুযোগও রয়েছে এসব কমিটির। বিভিন্ন বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ ও সুপারিশ করাও কমিটির অন্যতম কাজ।
ফলে এসব কমিটির নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্য থাকলে সরকারের কার্যক্রমের ওপর সংসদীয় নজরদারি আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিদ্যমান সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোয় অবশ্য বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
জুলাই সনদে কী বলা হয়েছে
জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান—এই চারটি কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এই ব্যবস্থা স্থায়ী হয়, সে জন্য সংবিধানে এ-সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও ছিল।
বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট জুলাই সনদের এই প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রস্তাবটি এখনই বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করা বাধ্যতামূলক নয়। কারণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে নির্বাচিত হবেন, সে বিষয়ে সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সরকার চাইলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এখন থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে।
কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া কী
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদে গৃহীত প্রস্তাবের মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা নিযুক্ত হন। সংসদ কোনো সদস্যকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত না করলে কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি নির্বাচন করতে পারেন।
কার্য উপদেষ্টা কমিটি, পিটিশন কমিটিসহ কয়েকটি কমিটির সদস্য স্পিকার মনোনয়ন করেন। এর বাইরে বিষয়ভিত্তিক ও মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত অধিকাংশ কমিটি সংসদে ভোটের মাধ্যমে গঠিত হয়।
সাধারণত সংসদ নেতার পক্ষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেন। সেই প্রস্তাব পাস হওয়ার পর কমিটি গঠিত হয়।
বর্তমান সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় কমিটির গঠন ও সভাপতি নির্বাচনেও তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব বেশি। এ কারণে সরকারি দল যে ধরনের কমিটি গঠন করতে চাইবে, সংসদে সেটিই অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অতীতেও বিরোধী দলকে কয়েকটি সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছিল
সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যকে দেওয়া হয়েছিল।
একাদশ জাতীয় সংসদে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও বিরোধী দল থেকে করা হয়েছিল।
এবারও সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দলের সংসদীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে। তবে এখন পর্যন্ত গঠিত মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত অন্য নয়টি কমিটির সভাপতির কেউ বিরোধী দলের নন।
বিরোধী দলের অভিযোগ, শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে
বিরোধী দলের একটি সূত্র জানায়, কমিটি গঠনের আগে তাদের সঙ্গে সরকারি দলের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল। সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের কোন কোন সদস্যকে রাখা হবে, সে বিষয়ে তাদের কাছে নামও চাওয়া হয়েছিল।
বিরোধী দল তখন জুলাই সনদের কথা তুলে ধরে আসনসংখ্যার অনুপাতে সভাপতি পদ দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু তাদের অভিযোগ, সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়—সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদও দেওয়া হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান মোমেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী দলকে সভাপতি পদ না দেওয়ার সঙ্গে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তাদের অংশগ্রহণকে যুক্ত করা হচ্ছে। তিনি সরকারি দলের এই অবস্থানকে জুলাই সনদের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
বিরোধী দলের ভাষ্য, জুলাই সনদে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়ে যে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য তাদের সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে সদস্য দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে বিরোধ
গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ।
বিরোধী দলকে ওই কমিটিতে পাঁচজন সদস্যের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল কোনো নাম দেয়নি। তারা কমিটি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, জুলাই সনদ অনুযায়ী তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে থাকলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের ধারণাগত মতভিন্নতা রয়েছে।
বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলেও বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের জন্য কমিটিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ এখনও উন্মুক্ত রয়েছে। তারা নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এই বিরোধই এখন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের আলোচনাতেও প্রভাব ফেলছে।
সরকারি দলের অবস্থান কী
সরকারি দলের একটি সূত্রের ভাষ্য, জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করার বিষয়ে বিএনপি আগে থেকেই সম্মতি জানিয়েছে। কিন্তু সনদ বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সংবিধান সংশোধন। এ জন্যই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরকারি দলের যুক্তি হলো, বিরোধী দল যদি সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় অংশ না নেয়, তাহলে জুলাই সনদের অন্যান্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
তাদের মতে, সংবিধান সংশোধনের পর জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়টিও রয়েছে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে, এর আগে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা সেটি গ্রহণ করেনি। ফলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনেও অতীতের রীতি অনুসরণ করা হবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেছেন, অতীতের রীতি অনুযায়ী এবার সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। অতীতে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল এবং এবারও তা করা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলো আগামী অধিবেশনে গঠন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি কাজ করছে।
ইতিমধ্যে যেসব কমিটি গঠন হয়েছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত নয়টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো—মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, পানিসম্পদ, শিল্প, পরিকল্পনা, অর্থ এবং আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
এই নয়টি কমিটির সব কটির সভাপতি হয়েছেন সরকারি দল বা তাদের মিত্রদের সদস্যরা।
বিষয়ভিত্তিক ছয়টি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
বাকি পাঁচটি হলো কার্য উপদেষ্টা কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি, সংসদ কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি এবং বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি।
তৃতীয় অধিবেশনে বড় সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, নতুন সংসদের যাত্রা শুরুর প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আগামী ২৭ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। ফলে এই অধিবেশনেই বাকি ৩৫টি স্থায়ী কমিটি গঠনের বিষয়টি সামনে আসবে।
এর মধ্যে পরিকল্পনা ও আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত দুটি কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ এসব কমিটির সভাপতি আবদুল মঈন খান ও আন্দালিভ রহমান পার্থ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় তাঁদের কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা সম্ভব হবে না।
ফলে আগামী অধিবেশনে শুধু নতুন কমিটি গঠন নয়, বিদ্যমান কয়েকটি কমিটির নেতৃত্ব নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত, জবাবদিহির জন্য দ্রুত কমিটি দরকার
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ মনে করেন, সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটিগুলো দ্রুত গঠন করা জরুরি।
তাঁর মতে, জুলাই সনদ অনুযায়ী চারটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি অবশ্যই বিরোধী দল থেকে পাওয়ার কথা। এর পাশাপাশি সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটিগুলোর প্রায় ২৬ শতাংশ সভাপতি পদও বিরোধী দলের পাওয়া উচিত।
তিনি আরও মনে করেন, এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে এখনই সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য নয়। বরং দীর্ঘ মেয়াদে যাতে এই ব্যবস্থা টেকসই হয়, সে জন্যই এটিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
সামনে কী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ঘিরে তাই স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দল কমিটির নেতৃত্বে অংশীদারিত্ব চাইছে, অন্যদিকে সরকারি দল সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণকে সনদ বাস্তবায়নের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করছে।
ফলে আগামী অধিবেশনে বাকি ৩৫টি কমিটি গঠনের সময় বিরোধী দলকে কতগুলো সভাপতি পদ দেওয়া হবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
বিষয়টি শুধু পদ বণ্টনের প্রশ্ন নয়। সংসদীয় কমিটিগুলো নির্বাহী বিভাগের কাজ পর্যালোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। তাই এসব কমিটির নেতৃত্বে সরকারি ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণের ভারসাম্য সংসদের কার্যকারিতা এবং সরকারের ওপর সংসদীয় নজরদারির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতপার্থক্য এবং অতীতের সংসদীয় রীতির মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করা হবে—তার অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী অধিবেশনে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের ওপর। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতার পথেই কি বিরোধী দলকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া হবে, নাকি অতীতের রীতিই অনুসরণ করবে সরকার।