বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু খরচ মেটানো সম্ভব হয়, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়। তবে বিদেশে গিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি, সময়সীমা ও কাজের ধরন মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের স্টুডেন্ট ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিতে পড়তে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকলেও দেশভেদে নিয়মে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব দেশে শিক্ষার্থীদের কাজের সময়সীমা ও সম্ভাব্য আয়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
কোন দেশে কত ঘণ্টা কাজের সুযোগ
বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথমেই জানা জরুরি—স্টুডেন্ট ভিসায় কাজের অনুমতি থাকলেও নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে কাজ করলে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই চাকরি শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি বিধিবিধান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণত সপ্তাহে প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পড়াশোনার সময় ক্যাম্পাসের ভেতরে কাজ করার সুযোগই বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া, প্রশাসনিক বিভাগ, গবেষণাগার কিংবা বিভিন্ন ক্যাম্পাস সেবার সঙ্গে যুক্ত কাজ শিক্ষার্থীরা করতে পারেন।
যুক্তরাজ্যে ক্লাস চলাকালে সাধারণত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করা যায়। নির্ধারিত ছুটির সময়ে অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণকালীন কাজের সুযোগ থাকে। ফলে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা একাডেমিক সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খণ্ডকালীন চাকরি করতে পারেন। তবে সব ধরনের কাজ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনুমোদিত নয়। তাই চাকরি নেওয়ার আগে ভিসার শর্ত যাচাই করা জরুরি।
কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ক্লাস চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করতে পারেন। এই সুযোগ কানাডাকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে খণ্ডকালীন কাজের জন্য তুলনামূলক আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে কাজের অনুমতি ও সময়সীমা নিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে চলতে হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। অর্থাৎ গড়ে সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টার মতো কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারি ছুটির সময়ে কাজের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা থাকে না। ফলে নির্দিষ্ট ছুটির সময় শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি সময় কাজ করে আয় করার সুযোগ পান।
জার্মানিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বছরে সর্বোচ্চ ১৪০ পূর্ণ দিন বা ২৮০ অর্ধদিবস কাজের অনুমতি রয়েছে। সেমিস্টার চলাকালে সাধারণত সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ না করার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। জার্মানিতে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে চাইলে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ভিসা ও বসবাসের অনুমতিপত্রের শর্তগুলো খেয়াল রাখতে হবে।
যুক্তরাজ্যে টিউশনে আয়ের সুযোগ বেশি
খণ্ডকালীন কাজের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সাধারণত রিটেইল, রেস্তোরাঁ, হসপিটালিটি ও বিভিন্ন সার্ভিস খাতে কাজের সুযোগ পান। যুক্তরাজ্যে এসব খাতে ঘণ্টায় প্রায় ১১ থেকে ১৪ পাউন্ড আয় করা যেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার ৩৫০ টাকা।
তবে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা থাকলে আয়ের সুযোগ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান বা ইংরেজির মতো বিষয়ে ভালো দক্ষতা থাকা শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত টিউশনের মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি আয় করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ঘণ্টায় প্রায় ১৫ থেকে ৩০ পাউন্ড পর্যন্ত আয় সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা।
ফলে যুক্তরাজ্যে শুধু সাধারণ খণ্ডকালীন চাকরিই নয়, শিক্ষার্থীর নিজস্ব একাডেমিক দক্ষতাও আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।
কানাডায় ক্যাম্পাসের চাকরিতে বেশি আয়
কানাডায় রিটেইল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সাধারণ খণ্ডকালীন কাজে ঘণ্টায় প্রায় ১৫ থেকে ১৮ কানাডীয় ডলার আয় করা যায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৬২০ টাকা।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। শিক্ষক সহকারী বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করলে ঘণ্টায় প্রায় ২৫ থেকে ৪০ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত আয় করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ২ হাজার ২১৫ থেকে ৩ হাজার ৫৪৫ টাকা।
এ ছাড়া গবেষণা সহকারী বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও শিক্ষার্থীরা কাজ করতে পারেন। এ ধরনের কাজে ঘণ্টায় প্রায় ২০ থেকে ৩৫ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এসব কাজ শুধু আয়ের সুযোগই তৈরি করে না, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ও গবেষণার ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা যোগ করতে পারে।
তবে কানাডায় ন্যূনতম মজুরি প্রদেশভেদে আলাদা। তাই কোনো নির্দিষ্ট শহর বা প্রদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার আগে সেখানে প্রচলিত মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কাজের সুযোগ সম্পর্কে আলাদা করে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ায় তুলনামূলক বেশি মজুরি
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন কাজের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। দেশটির তুলনামূলক উচ্চ মজুরি শিক্ষার্থীদের কাজের মাধ্যমে দৈনন্দিন খরচের একটি অংশ সামলানোর সুযোগ তৈরি করে।
রিটেইল ও হসপিটালিটি খাতে ঘণ্টায় প্রায় ২৭ থেকে ৩০ অস্ট্রেলীয় ডলার আয় করা যেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ আনুমানিক ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
আর কোনো শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট বিষয়ে ভালো দক্ষতা থাকলে টিউশনের মাধ্যমে আরও বেশি আয় করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ঘণ্টায় প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ অস্ট্রেলীয় ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে।
তবে বেশি মজুরি মানেই বেশি সঞ্চয়—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অস্ট্রেলিয়ার বড় শহরগুলোতে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। ফলে মোট আয় ও মোট ব্যয়ের হিসাব করেই শিক্ষার্থীদের আর্থিক পরিকল্পনা করা উচিত।
খণ্ডকালীন কাজের আয় দিয়ে কোন খরচ সামলানো যায়
বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের মূল সুবিধা হলো দৈনন্দিন ছোট ও মাঝারি খরচের একটি অংশ নিজের আয় থেকে বহন করা। বাজার-সদাই, যাতায়াত, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল, ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিংবা অন্যান্য নিয়মিত ব্যয় মেটাতে এই আয় কাজে লাগতে পারে।
এর ফলে পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ টিউশন ফি, বাসাভাড়া ও অন্যান্য বড় খরচের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকবেন, তাঁদের জন্য নিজের কিছু খরচ নিজে বহন করার সক্ষমতা আর্থিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে খণ্ডকালীন কাজের আয়কে কখনোই বিদেশে পড়াশোনার পুরো অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কারণ কাজ পাওয়া সবসময় নিশ্চিত নয় এবং একাডেমিক চাপ, পরীক্ষার সময়সূচি, ছুটি কিংবা স্থানীয় শ্রমবাজারের পরিস্থিতির কারণে কাজের সময় ও আয় কমে যেতে পারে।
ভিসার শর্ত না মানলে হতে পারে জটিলতা
বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—কাজের অনুমতি সম্পর্কিত নিয়ম জানা। একটি দেশে যে সংখ্যক ঘণ্টা কাজ বৈধ, অন্য দেশে সেই একই সময় কাজ করা বৈধ নাও হতে পারে। এমনকি একই দেশে পড়াশোনার সময় ও ছুটির সময় কাজের নিয়মে পার্থক্য থাকতে পারে।
তাই অন্য শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি অভিবাসন ও শিক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নিয়ম যাচাই করা উচিত। ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে অতিরিক্ত সময় কাজ করলে ভবিষ্যতে ভিসা নবায়ন, আবাসনের অনুমতি কিংবা অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
পড়াশোনাকে রাখতে হবে প্রথম অগ্রাধিকার
বিদেশে গিয়ে খণ্ডকালীন কাজ করে আয় করার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সময় ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় কাজ করলে ক্লাসে উপস্থিতি, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা ও গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী নতুন দেশে গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন, তাঁদের প্রথম দিকে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি, ভাষা, পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। এ সময় অতিরিক্ত কাজের চাপ নিলে একাডেমিক ফলাফল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই খণ্ডকালীন চাকরি বেছে নেওয়ার সময় শুধু ঘণ্টাপ্রতি আয় নয়, কাজের সময়সূচি, যাতায়াতের সময়, কাজের পরিবেশ এবং পড়াশোনার সঙ্গে সেটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিদেশে যাওয়ার আগে যে হিসাব জরুরি
বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করার সময় খণ্ডকালীন কাজকে অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করাই নিরাপদ। শিক্ষার্থীকে প্রথমেই টিউশন ফি, বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
এরপর সম্ভাব্য খণ্ডকালীন আয়কে সেই বাজেটের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। এতে কাজ না পাওয়া, কম ঘণ্টা কাজের সুযোগ পাওয়া কিংবা কোনো মাসে আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও আর্থিক সংকটে পড়ার ঝুঁকি কমবে।
সব মিলিয়ে, বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি আয়, কর্ম-অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের ভালো সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসার নিয়ম মেনে চলা, কাজের সময়সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং পড়াশোনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। খণ্ডকালীন চাকরি যেন শিক্ষার সহায়ক হয়, শিক্ষার বিকল্প নয়—বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করার সময় এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া