২০১৩ সালে যখন মজার ইশকুলের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন সঙ্গে যুক্ত হওয়া শিশুদের নিয়ে এসএসসি পরীক্ষার কথা ভাবার সুযোগও ছিল না। তখনকার বাস্তবতায় লক্ষ্য ছিল আরও মৌলিক—একটি শিশু পরদিন আবার স্কুলে আসবে কি না, সেটি নিশ্চিত করা।
কারণ, মজার ইশকুলের অনেক শিক্ষার্থীর জীবনেই স্কুল ছিল না স্বাভাবিক কোনো বিষয়। কেউ পথের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কেউ বস্তিতে বেড়ে উঠছিল। কারও পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন মা, কারও বাবা ছিলেন না। অনেক পরিবারেরই ছিল না পরের দিনের খাবারের নিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় একটি শিশুকে নিয়মিত স্কুলে রাখা, পরিবারকে বোঝানো এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেই জায়গা থেকে দীর্ঘ ১৪ বছরের পথ পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে মজার ইশকুলের শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। আগারগাঁও ও মানিকনগর শাখা থেকে মোট ২০ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে মানিকনগর শাখার ১২ পরীক্ষার্থীর ১১ জনই উত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ এ শাখায় পাসের হার প্রায় ৯২ শতাংশ।
সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো বড় কোনো পরিসংখ্যান নয়। কিন্তু এই ৯২ শতাংশের পেছনের গল্পগুলো জানলে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের লড়াই, পরিবারকে ধরে রাখা, ঝরে পড়া ঠেকানো এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কুলসুমের জিপিএ ৪.৮৩, পরিবারের প্রথম এসএসসি পাস
মজার ইশকুলের প্রথম এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুলসুমের গল্পটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। যে বাস্তবতায় তার নিয়মিত পড়াশোনাই চালিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল, সেই বাস্তবতা পেরিয়ে বিজ্ঞান বিভাগের মতো কঠিন বিষয়ে এমন ফলাফল করেছে কুলসুম।
কুলসুম শুধু নিজের শিক্ষাজীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার হয়নি, তার পরিবারেও তৈরি করেছে নতুন একটি ইতিহাস। পরিবারের প্রথম এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থী সে। ফলে ফল প্রকাশের পর পরিবারে এসেছে অন্য রকম আনন্দ।
রিকশাচালক বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এ আনন্দ যেমন কুলসুমের, তেমনি মজার ইশকুলের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে বলেও তার মধ্যে রয়েছে গর্ব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে পরিবারের ভবিষ্যৎ ভাবনায়। কুলসুমের ফলাফল তাদের সামনে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
একটি শিশুর এসএসসি পাস করা যেখানে পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষাগত সাফল্যে পরিণত হয়, সেখানে একটি পরীক্ষার ফলাফল কেবল একটি গ্রেড বা জিপিএর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
বাল্যবিবাহের বাস্তবতা পেরিয়ে তাসপিয়ার কলেজের স্বপ্ন
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৭২ পেয়েছে তাসপিয়া। নিজের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছে সে। ফল প্রকাশের পর আগারগাঁওয়ের কুমিল্লা বস্তিতে থাকা তার পরিবারে নেমে আসে আনন্দের আবহ।
তাসপিয়ার সঙ্গে মজার ইশকুলের সম্পর্ক আরও দীর্ঘ। বর্ণপরিচয় শেখা থেকে শুরু করে এসএসসির ফলাফল পর্যন্ত দীর্ঘ পথ সে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হেঁটেছে। সেই যাত্রায় অনেক পরিবর্তন দেখেছে তার চারপাশ।
তাসপিয়ার সমবয়সী আশপাশের অনেক মেয়েরই এরই মধ্যে বাল্যবিবাহ হয়ে গেছে। একই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়েও তাসপিয়া সেই পথ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পেরেছে। এসএসসি পাস করার পর এখন তার সামনে নতুন লক্ষ্য—কলেজে ভর্তি হওয়া এবং আরও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা।
একটি মেয়েকে শুধু স্কুলে ভর্তি করানোই যে যথেষ্ট নয়, তাকে এমন একটি পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া দরকার, যেখানে সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—তাসপিয়ার গল্পে তারই একটি উদাহরণ দেখা যায়।
সুমাইয়ার ফলাফলে মায়ের চোখে আনন্দের কান্না
একই শাখার শিক্ষার্থী সুমাইয়া জিপিএ ৩.৭২ পেয়ে এসএসসি পাস করেছে। ফল প্রকাশের পর তার মা মজার ইশকুলের অফিসে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানান, প্রকাশ করেন কৃতজ্ঞতা।
তার মায়ের বক্তব্য ছিল, মজার ইশকুল না থাকলে মেয়েকে এত দূর পর্যন্ত পড়ানোর সামর্থ্য হয়তো তাঁর ছিল না।
তবে আনন্দের সেই কান্নার মধ্যেও ছিল নতুন এক দুশ্চিন্তা। এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করানোর পর এবার কলেজের খরচ কীভাবে চলবে—এটাই হয়ে ওঠে পরিবারের নতুন চিন্তা।
মজার ইশকুলের পক্ষ থেকে তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, সুমাইয়ার পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথেও পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে।
কুলসুম, তাসপিয়া ও সুমাইয়ার তিনটি গল্পই দেখায়, কেন মজার ইশকুলের কাছে এবারের এসএসসি ফলাফল কেবল কয়েকটি সংখ্যা নয়। প্রত্যেকটি ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি পরিবারের সংগ্রাম, একটি শিশুর দীর্ঘ পথচলা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ।
এসএসসি নয়, লড়াই শুরু হয়েছিল আরও আগে
মজার ইশকুলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন কখনোই ছিল না—তারা এসএসসি পাস করবে কি না। বরং প্রথম প্রশ্ন ছিল, তারা আদৌ স্কুলে থাকবে কি না।
পরিবারের আর্থিক চাপ শিশুটিকে শিশুশ্রমে নিয়ে যাবে কি না, মেয়েটির বাল্যবিবাহ হয়ে যাবে কি না, পরিবার অন্য জায়গায় চলে গেলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে কি না—এসবই ছিল বাস্তব ও তাৎক্ষণিক প্রশ্ন।
অনেক শিক্ষার্থীর স্কুলে ভর্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ছিল না। জন্মসনদ তৈরির জন্য অভিভাবকদের সঙ্গে বারবার বসতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য জন্মস্থান থেকে তথ্য আনতে হয়েছে। বাইরে থেকে ছোট মনে হওয়া এসব বিষয়ও অনেক সময় একটি শিশুর শিক্ষাজীবন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে।
তাই মজার ইশকুলের কাছে একটি শিশুকে এসএসসি পরীক্ষার হলে বসতে দেখাটাও ছিল একটি বড় অর্জন।
একটি শিক্ষার্থী যখন বছরের পর বছর স্কুলে টিকে থাকে, তখন সেই ধারাবাহিকতার পেছনে শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থাকে না। থাকে পরিবারকে বোঝানো, অর্থনৈতিক সংকট সামলানো, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা, শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকি থেকে তাকে দূরে রাখার চেষ্টা।
ঝরে পড়া ঠেকানোও বড় সাফল্য
শিক্ষার সাফল্যকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পরিমাপ করে না মজার ইশকুল। একটি শিশুকে ঝরে পড়া থেকে ধরে রাখাও তাদের কাছে সাফল্য। তাকে নিয়মিত স্কুলে ফিরিয়ে আনাও সাফল্য। পরিবারের প্রথম এসএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে দাঁড়ানোও সাফল্য।
আর একজন শিক্ষার্থী যখন এসএসসি পাস করার পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, সেটিকে আরও বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়।
কারণ শিক্ষা শুধু একটি সার্টিফিকেট দেয় না। শিক্ষা একজন শিশুকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। নিজের পরিবারের বাস্তবতা বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দেয়।
এই কারণেই এসএসসি পরীক্ষার পর মজার ইশকুলের কাছে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—এরপর কী?
এসএসসির পরও পথচলা
প্রথম এসএসসি ব্যাচের দুই শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছরের বেশি। তারা ইতিমধ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। অন্যরা কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মজার ইশকুলের লক্ষ্য, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথ যেন একরকম না হলেও প্রত্যেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। কেউ উচ্চশিক্ষায় যাবে, কেউ কারিগরি বা অন্যান্য দক্ষতা অর্জন করবে, কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করবে—পথ আলাদা হতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য একটাই, তারা যেন নিজেদের জীবন সম্পর্কে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
এসএসসি পাস তাই এই শিক্ষার্থীদের জন্য শেষ গন্তব্য নয়। বরং এটি নতুন একটি পর্যায়ের শুরু।
একার পক্ষে সম্ভব নয় এই পরিবর্তন
মজার ইশকুলের ১৪ বছরের যাত্রা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—একটি শিশুর জীবন কোনো প্রতিষ্ঠান একা বদলে দিতে পারে না।
এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষক, পরিবার, স্বেচ্ছাসেবক, দাতা, স্পনসর এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষের, যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বাস করবেন যে প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুটিও পারবে।
মজার ইশকুলের প্রথম এসএসসি ব্যাচের পেছনেও রয়েছে এমন অসংখ্য মানুষের শ্রম ও সহযোগিতা। তাই এই অর্জন কোনো একজন ব্যক্তির নয়, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানেরও নয়। এটি বহু মানুষের ছোট ছোট প্রচেষ্টার সম্মিলিত ফল।
২০১৩ সালে কয়েকজন শিশুকে নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পেছনে ছিল একটি বড় স্বপ্ন—পথশিশুমুক্ত বাংলাদেশ। দীর্ঘ ১৪ বছরের পথচলায় সেই স্বপ্নের বাস্তবতা যেমন সামনে এসেছে, তেমনি স্পষ্ট হয়েছে এর কঠিন দিকগুলোও।
একটি শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসার চেয়ে তাকে বছরের পর বছর স্কুলে ধরে রাখা কঠিন। তাকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া আরও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এরপর উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া আরও বড় দায়িত্ব।
১৪ বছরের যাত্রায় নতুন শুরু
মজার ইশকুলের প্রথম এসএসসি পরীক্ষার ফল তাই কোনো সমাপ্তির গল্প নয়। বরং এটি নতুন একটি শুরুর গল্প।
২০১৩ সালে যে বিশ্বাস নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল—এই শিশুরাও পারবে—২০২৬ সালে এসে সেই বিশ্বাস আর শুধু স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিছু ছেলেমেয়ের হাতে এখন তার বাস্তব প্রমাণও রয়েছে—এসএসসি সনদ।
৯২ শতাংশ পাসের হার তাই এখানে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্কুলে টিকে থাকার লড়াই, বস্তির প্রতিকূলতা, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এই ফলাফল দেখিয়েছে—সুযোগ, সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি যত্ন পেলে কঠিন বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা শিশুরাও স্বপ্ন দেখতে পারে, সেই স্বপ্নের জন্য লড়তে পারে এবং একদিন হাতে তুলে নিতে পারে নিজেদের সাফল্যের সনদ।