ঢাকা

ইসরায়েলে প্রথম ‘ড্যান্সিং ক্ষেপণাস্ত্র’ হামলা, শক্তিমত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ইসরায়েলে প্রথমবারের মতো ইরানের বহুল আলোচিত সেজিল-২ মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সর্বাধুনিক একাধিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সেজিল-২ ব্যবহার করা হয়েছে।

এই ক্ষেপণাস্ত্রকে অনেকে ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ বা ‘নাচুনে ক্ষেপণাস্ত্র’ বলে উল্লেখ করেন—উড্ডয়নপথে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতার কারণে এ নামকরণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি প্রতীকী অস্ত্র নয়; বরং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


সেজিল-২: কী এই ক্ষেপণাস্ত্র

Sejjil-2 হলো ইরানের তৈরি একটি কঠিন জ্বালানিচালিত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (MRBM)। এটি ‘সাজিল’, ‘আশৌরা’ বা ‘আশুরা’ নামেও পরিচিত।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী:

  • পাল্লা: প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার

  • ওয়ারহেড বহনক্ষমতা: আনুমানিক ৭০০ কেজি

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ১৮ মিটার

  • ওজন: প্রায় ২৩,৬০০ কেজি

  • জ্বালানি: কঠিন (Solid Fuel)

কঠিন জ্বালানির ব্যবহারের কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটি দ্রুত প্রস্তুত ও উৎক্ষেপণযোগ্য। তরল জ্বালানিচালিত পুরোনো শাহাব সিরিজের তুলনায় এটি মোতায়েনের ক্ষেত্রে বেশি কৌশলগত সুবিধা দেয়।


কেন ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ বলা হয়?

সেজিল-২ উচ্চ উচ্চতায় উড্ডয়নকালে গতিপথে সীমিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্য শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্দিষ্ট প্যারাবলিক পথে চলে, কিন্তু সেজিল-২ কিছুটা ম্যানুভারিং সক্ষমতা রাখে বলে ধারণা করা হয়। এর ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—যেমন ইন্টারসেপ্টর মিসাইল—নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।


উন্নয়ন ও পরীক্ষা

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক Center for Strategic and International Studies (সিএসআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী:

  • ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে নকশা প্রক্রিয়া শুরু

  • ২০০৮ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ (প্রায় ৮০০ কিমি অতিক্রম)

  • ২০০৯ সালে দ্বিতীয় পরীক্ষা

  • পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর একটিতে প্রায় ১,৯০০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছায়

সাম্প্রতিক সংঘাতে যুদ্ধের ১৬তম দিনে এটি ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে, যা এই অস্ত্রের কার্যকর যুদ্ধক্ষেত্র প্রয়োগের প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


সংঘাতের প্রেক্ষাপট

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর সংঘাত ব্যাপক আকার নেয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ১৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে ইতিমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন—যাদের বেশির ভাগই ইরানি নাগরিক।


মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি

যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, USS Tripoli যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে প্রায় ২,৫০০ মেরিন সেনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি সম্ভাব্য স্থল বা উপকূলীয় অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত হতে পারে।


আঞ্চলিক ও কৌশলগত প্রভাব

সেজিল-২ ব্যবহারের দাবি মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়:

  1. দূরপাল্লার প্রতিরোধ সক্ষমতা: ইসরায়েলসহ আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটি ইরানের সরাসরি পাল্লার মধ্যে।

  2. দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা: কঠিন জ্বালানির কারণে দ্রুত উৎক্ষেপণ সম্ভব।

  3. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ: ম্যানুভারিং বৈশিষ্ট্য আকাশ প্রতিরক্ষাকে জটিল করে।

  4. সংঘাতের বিস্তৃতি ঝুঁকি: আঞ্চলিক শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।


সামগ্রিক মূল্যায়ন

সেজিল-২ কেবল একটি প্রযুক্তিগত অস্ত্র নয়; এটি ইরানের কৌশলগত প্রতিরোধ নীতির অংশ। এর ব্যবহার (বা ব্যবহারের দাবি) রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও বহন করে—বিশেষ করে যখন সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো কতটা জড়াবে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি সংঘাতের চরিত্র কতটা বদলে দেবে—এসব প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স