কুষ্টিয়ার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা। তিনি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করে জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করতে হবে। তা না হলে তাঁদের কুষ্টিয়া থেকে বিদায় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শনিবার নিজের গাড়িতে হামলার অভিযোগের প্রতিবাদে রোববার বিকেলে কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।
আমির হামজা বলেন, ‘কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করা যাবে না, সে যে-ই হোক। আপনারা সরকারি লোক, সরকারি দায়িত্ব পালন করবেন। এই কুষ্টিয়ায় ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি—যাঁরা সরকারি দায়িত্বে আছেন, জনগণের জন্য যদি কাজ করেন, কুষ্টিয়ায় থাকবেন। জনগণের জন্য কাজ না করলে আপনাদের আমরা বিদায় দিতে বাধ্য হব।’
গাড়িতে হামলার প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ
শনিবার সন্ধ্যায় আমির হামজার গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠার পরদিন এ কর্মসূচি পালন করে জেলা জামায়াত। রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়।
জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা মিছিলে যোগ দেন। মিছিলে অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
মিছিলটি কালেক্টরেট চত্বর থেকে মজমপুর এলাকা হয়ে এসএন রোড দিয়ে শহরের ছয় রাস্তার মোড়ের দিকে যায়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ছয় রাস্তার মোড়ে মিছিল শেষ হয়। পরে থানাপাড়া মসজিদের সামনে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে আমির হামজা শনিবারের হামলার ঘটনাকে তাঁর ওপর হত্যাচেষ্টার অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় সামনে ও পেছনে পুলিশের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তাঁর গাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে।
গণ অধিকার পরিষদকে ‘সন্ত্রাসী দল’ বলার অভিযোগ
আমির হামজা তাঁর গাড়িতে হামলার জন্য গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া তাঁদের আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন মন্তব্য করে তিনি সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘এখন আর গণ অধিকার পরিষদ নেই, এটা গণধিকৃত পরিষদে পরিণত হয়ে গেছে।’
নিজেকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি উল্লেখ করে আমির হামজা বলেন, পুলিশের গাড়ির নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও তাঁর গাড়িতে হামলা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের ‘সন্ত্রাসী’ বলতে কোনো বাধা নেই।
তবে গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে এর আগে সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা অভিযোগ করা হয়েছে। দলটির কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ দাবি করেন, তাঁদের পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের শেষ পর্যায়ে আমির হামজা ও আশপাশে থাকা জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। তাঁদের এক কর্মীর পায়ের দুই রগ কেটে দেওয়া এবং আরও কয়েকজনের আহত হওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
অর্থাৎ শনিবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি
বিক্ষোভ সমাবেশে আমির হামজা বলেন, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও ‘তৌহিদি জনতা’ কুষ্টিয়ায় থাকা পর্যন্ত কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না।
তিনি জানান, গাড়িতে হামলার ঘটনায় তাঁরা থানায় মামলা করেছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা না হলে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ঘেরাও করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
আমির হামজার বক্তব্যে হামলার ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির বার্তাও উঠে আসে।
‘কুষ্টিয়ায় চাঁদাবাজি চলবে না’
সমাবেশে কুষ্টিয়ায় চাঁদাবাজি বন্ধেরও ঘোষণা দেন আমির হামজা। তিনি বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমি তো বলেছি, এখানকার সরকারই আমি। সুতরাং এই আসনে কোনো চাঁদাবাজি চলবে না। কেউ চাঁদা দেবেন না, কেউ কারও কাছে চাঁদা নেবেন না।’
কেউ চাঁদা চাইলে তাঁর নাম উল্লেখ করে জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
জামায়াত-শিবিরের ‘ট্যাগ’ রাজনীতির সমালোচনা
বক্তব্যের শেষ দিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ তোলেন আমির হামজা।
তিনি বলেন, গত ৫৫ বছর ধরে জামায়াত-শিবিরের ওপর বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দেওয়ার যে রাজনীতি হয়েছে, সেটিকে তিনি ভারতের একটি ‘নাটক’ হিসেবে দেখেন।
তাঁর দাবি, বাংলাদেশে এখন আর মানুষ এসব রাজনৈতিক তকমা গ্রহণ করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
থানায় দুটি পক্ষের এজাহার
এদিকে আমির হামজার গাড়িতে হামলার ঘটনায় রোববার কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি এজাহার জমা দেওয়া হয়েছে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মোমিন বিশ্বাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে এজাহারটি জমা দেন।
এজাহারে গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে। এতে ২৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে জানান, তিনি এজাহার পেয়েছেন এবং মামলার প্রক্রিয়া চলছে।
একই ঘটনায় গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া সদর উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রুমন হোসেনও থানায় পৃথক একটি এজাহার দিয়েছেন। দুপুরের দিকে দেওয়া ওই এজাহারে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ওসি জানান, ওই এজাহারটিও মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
ফলে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পক্ষ থেকেই থানায় পৃথক অভিযোগ জমা পড়েছে। পুলিশের তদন্তে হামলার প্রকৃত ঘটনা ও দায় কার—তা নির্ধারণের বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।
পাল্টা অভিযোগ নিয়ে গণ অধিকার পরিষদের সংবাদ সম্মেলন
এদিকে আমির হামজার গাড়িতে হামলার অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে রোববার রাতে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে গণ অধিকার পরিষদ।
সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শনিবারের ঘটনার সময় তাঁদের নেতা-কর্মীরাই হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের এক কর্মীর পায়ের দুই রগ কেটে দেওয়া হয়েছে এবং আরেক নেতার নাক ও কপালে গুরুতর আঘাত লেগেছে বলেও দাবি করা হয়।
গণ অধিকার পরিষদের নেতারা আরও অভিযোগ করেন, জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে মালামাল, নগদ টাকা ও ইলেকট্রনিক পণ্য ভাঙচুর করা হয়েছে।
দলটির দাবি, তাঁদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আমির হামজার বক্তব্যে কুষ্টিয়ার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ডিসি, এসপি, ইউএনও ও ওসিসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে জনগণের জন্য কাজ না করলে তাঁদের বদলি বা ‘বিদায়’ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এতে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর জনপ্রতিনিধির প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক সংঘাত যাতে আরও বড় আকার না নেয়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমাবেশে জামায়াতের নেতারা
বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল গফুর, কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য আবজাল হোসেন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এনামুল হক, সাবেক সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দারসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শনিবারের হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোববারের এই কর্মসূচিতে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ থেকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়।
ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা
কুষ্টিয়ায় শনিবারের ঘটনা এরই মধ্যে দুই রাজনৈতিক পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও কর্মসূচির জন্ম দিয়েছে। একদিকে আমির হামজা ও জামায়াতে ইসলামী দাবি করছে, তাঁদের গাড়িতে হামলা করা হয়েছে এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে গণ অধিকার পরিষদ দাবি করছে, তাদের সমাবেশে হামলা চালানো হয়েছে এবং তাদের নেতা-কর্মীরা গুরুতর আহত হয়েছেন।
দুই পক্ষই থানায় পৃথক এজাহার দিয়েছে। ফলে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হামলার শুরু কীভাবে, কারা প্রথমে আক্রমণ করেছে, কারা আহত হয়েছে এবং কারা সম্পদ ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।
রাজনৈতিক বিরোধ যেন আরও সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুই পক্ষের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পরিস্থিতি শান্ত রাখার প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে।