ঢাকা

এক-এগারো কুচক্রী অভিযুক্ত লে. জে. মামুনের রিমান্ড, পুলিশি তদন্ত তীব্র

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

রাজধানীর মিরপুর থেকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে লে. জে. মামুন খালেদ–কে, যিনি বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)–এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে এবং গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করলে ঢাকা মহানগর আদালত জুলাই হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী


গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের প্রেক্ষাপট

ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক কফিল উদ্দিন আদালতে জানান, মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের আগে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০১০ সালের ১৯ জুলাই মিরপুরে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়ে দেলোয়ার হোসেন নিহত হন। তদন্তে জানা গেছে, ওই সময় মামুন খালেদ অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে দেশি ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত করে নির্দেশ দেন। প্রাথমিক তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাই মামুন খালেদকে পাঁচ দিনের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত অনুমোদন দেয়।


এক-এগারোর কুশীলব ও রাজনৈতিক ভোল বদলের কাহিনী

মামুন খালেদ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে ‘বহুরূপী’ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় কর্নেল পদে তিনি ডিজিএফআইয়ের মিডিয়া উইং–এর দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ে তিনি চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে দুর্নীতিতে লিপ্ত হন।

তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিনব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী–কে প্রজেক্ট পেপার ও সিডি সরবরাহের মাধ্যমে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার কাজও তিনি করতেন। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক আনুগত্যও পাল্টাতেন—একসময়ে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের, পরে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি।


আয়নাঘর ও ‘জঙ্গি নাটক’

ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকা সময়ে তিনি সংস্থাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার বানানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০১১–২০১৩ সালের মধ্যে আয়নাঘর নামে একটি গোপন বন্দিশালা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে চাকরিচ্যুত ও জেলহাজতে পাঠানোর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–কে সেনানিবাস থেকে উচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তিনি।


জলসিঁড়ি প্রকল্প ও অর্থ লুট

মামুন খালেদ জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ। তিনটি চুক্তি ও প্রকল্প পরিচালনার সময়ে অফিসারদের মধ্যে জমি ও প্লট বণ্টন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি সাবলাইম গ্রুপ ও অন্যান্য ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থ হাতিয়ে নেন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের খরচ, মিডিয়া ব্যবস্থাপনা, বেতন ও পরিকাঠামোর নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের তথ্য উঠে এসেছে।


শেয়ারবাজার ও চাঁদাবাজি

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় তিনি রাজনৈতিক দলের নামের আড়ালে শেয়ারবাজারে ব্যাপক চাঁদাবাজি করেছেন। বিএনপি নেতা একরামের অফিস থেকে জোরপূর্বক শেয়ার নেওয়া, বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ১৭০ কোটি টাকা লেনদেন—সব মিলিয়ে তার আর্থিক কর্মকাণ্ড চরম বিতর্কিত বলে অভিযোগ।


সাংবাদিকদের অভিযোগ

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, ডিজিএফআইয়ের কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই তিনি ৭০০ সাংবাদিককে একত্রিত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে বিবৃতি সংগঠিত করেছিলেন। এ ঘটনায় ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তারা তাকে অত্যাচারের শিকার করেছিলেন।


মামুন খালেদের আদালতে বক্তব্য

আদালতে তিনি দাবি করেন, আসিয়ানের নজরুলের ১৫০০ কোটি টাকা উদ্ধারের দায়িত্বে তিনি যুক্ত ছিলেন। আয়নাঘর বিষয়ে বলেন, “আমার মেয়াদে কোনো অভিযোগ ছিল না। ঘটনা ঘটার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। আমি দীর্ঘ সময় সিভিলিয়ান হিসেবে জীবনযাপন করেছি এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হইনি।”

তবে রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী অভিযোগ করেন, মামুন খালেদ এক-এগারোর কুশীলব ও পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে সহযোগিতার মাধ্যমে ডিজিএফআইয়ের প্রধান হন। তার সময় আয়নাঘর তৈরি হয়, যেখানে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করা হয় এবং জলসিঁড়ি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা হাতানো হয়।


এনসিপি, বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই গ্রেপ্তার ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। মামুন খালেদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে আগামী দিনে ২০০৬–২০১৩ সালের বিতর্কিত একাধিক ঘটনা ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স