নতুন এক নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠেছে ঋণখেলাপি সংসদ সদস্যদের বিষয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে নির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্য—including বাণিজ্য, শিল্প, এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির—এর নাম ছিল ঋণখেলাপির তালিকায়। সিলেট-১ আসন থেকে জয়ী মুক্তাদির ও অন্যান্য প্রার্থীর ঋণের তথ্য যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) দুটি তালিকা নির্বাচন কমিশনকে প্রেরণ করেছিল।
সিআইবির একটি তালিকায় ৮২ জনকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অপর তালিকায় ৩১ জনের নাম ছিল, যারা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়েছিলেন। মুক্তাদির এই তালিকায় ছিলেন। স্থগিতাদেশের কারণে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হন এবং জয়ী হয়ে সংসদে যোগ দেন। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, ‘ঋণখেলাপি যাঁদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাঁদের পারমিট করেছে বিধায়।’
নির্বাচনী হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও তাঁর স্ত্রীর নামে ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার ঋণ ছিল। কিন্তু মুক্তাদির জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সমস্ত ঋণ নিয়মিত হয়ে গিয়েছিল এবং আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি এখন আর প্রযোজ্য নয়।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঋণখেলাপি সংসদ সদস্যরা হলেন:
চট্টগ্রাম-৬: গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ৬৭৯ কোটি টাকার ঋণ, নির্বাচনের আগে স্থগিতাদেশে নির্বাচন করেন।
বগুড়া-১: কাজী রফিকুল ইসলাম, প্রাথমিকভাবে ৭৬৫ কোটি টাকার ঋণ থাকায় নির্বাচনে অযোগ্য ছিলেন, পরে স্থগিতাদেশে অংশ নেন।
কুমিল্লা-১০: মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণখেলাপি হলেও নির্বাচন কমিশন ও আদালতের স্থগিতাদেশে অংশ নেন।
বগুড়া-৫: গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ঋণ থাকলেও স্থগিতাদেশের সুবিধা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।
ময়মনসিংহ-৫: মোহাম্মদ জাকির হোসেন, প্রায় ৯৭ কোটি টাকার ঋণ স্থগিতাদেশে নির্বাচনের আগে নিয়মিত করেন।
চট্টগ্রাম-৪: মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, ১,৭০০ কোটি টাকার ঋণ স্থগিতাদেশে নির্বাচন করেন।
চট্টগ্রাম-২: সারোয়ার আলমগীর, ব্যাংকঋণ স্থগিতাদেশে নির্বাচনে অংশ নেন।
এছাড়া কুমিল্লা-৯ থেকে মো. আবুল কালাম, টাঙ্গাইল-৪ থেকে লুৎফর রহমান ওরফে মতিন এবং মৌলভীবাজার-৪ থেকে মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীও একই প্রক্রিয়ায় জয়ী হয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানো যাবে না—এমন আদেশ আদালত দিতেই পারেন। তবে সময়টা সীমাহীন না হওয়াই ভালো। ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে না পারা ব্যক্তিরা যত কম এমপি হোক। অন্যথায় স্বার্থের সংঘাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাবে, এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।’
অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম মনে করছেন, ঋণখেলাপিদের সংসদে আসার সুযোগ দেওয়াটা ‘খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত’ এবং এটি অর্থনীতি ও সুশাসনের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো ধারাবাহিকভাবে ঋণখেলাপি প্রার্থীরা সামান্য টাকা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করে আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হচ্ছেন, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসঙ্গতির ইঙ্গিত দেয়।