ঢাকা

চাকরি নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাঠ—ড্যাফোডিলের জাদুকরি রূপান্তর মডেল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশের কাতার পেরিয়ে ‘তারুণ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়—বিশাল তরুণ জনশক্তিকে আমরা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছি? প্রতিবছর অর্থসংকট, দিকনির্দেশনার অভাব ও দক্ষতার ঘাটতিতে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। এই অপচয় শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।

এই প্রেক্ষাপটে গত দেড় দশকে নীরবে একটি বিকল্প দর্শন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন। ‘দান’ নয়, ‘মেধায় বিনিয়োগ’—এই ধারণাকে সামনে রেখে তারা গড়ে তুলেছে এক ব্যতিক্রমী সামাজিক-অর্থনৈতিক মডেল, যা এখন অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।

দাতা নয়, অংশীদার হওয়ার দর্শন

প্রচলিতভাবে দান বা জাকাতকে দেখা হয় সাময়িক সহায়তা হিসেবে। কিন্তু ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন একে দেখছে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট’ বা মানবিক পুঁজি বিনিয়োগ হিসেবে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষায় সহায়তা মানে কেবল তাকে টিকিয়ে রাখা নয়; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।

গত ১৬ বছরে এই মডেলের আওতায় ২৭৯ জন শিক্ষার্থী নিবিড় সহায়তা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০২ জন বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খাতে উচ্চপদে কর্মরত অথবা সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ এক সময় যে সহায়তা ছিল সম্ভাবনায় বিনিয়োগ, তা আজ বহুগুণে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

দারিদ্র্য যখন হার মানল মেধার কাছে

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। প্রখর মেধা থাকা সত্ত্বেও মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। দিনমজুর বাবার সীমিত আয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছিল প্রায় অধরা।

এই সংকটময় সময়ে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের সহায়তা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কেবল টিউশন ফি নয়, আবাসন, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং সফট স্কিল উন্নয়নের সুযোগ পান তিনি। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের ফলে তিনি কর্মবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।

আজ তিনি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। তাঁর ভাষায়, “আমাকে যদি শুধু কিছু অর্থ দেওয়া হতো, হয়তো একটি ডিগ্রি পেতাম। কিন্তু এখানে আমার মেধায় বিনিয়োগ করা হয়েছে—আমাকে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।”

ডিগ্রি নয়, লক্ষ্য যেখানে কর্মসংস্থান

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অন্যতম সংকট—ডিগ্রি আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই। ড্যাফোডিল মডেল এই ব্যবধান কমাতে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মুক্তিকে একটি চক্রের মধ্যে এনেছে।

১৬টি ব্যাচে মোট ২৭৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তির আওতায় এসেছে। বর্তমানে ৯০ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাচ্ছেন এবং ১৮৯ জন সফলভাবে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেছেন। তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানে যুক্ত অথবা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

এই মডেলের বিশেষত্ব হলো—শিক্ষার্থীকে শুরু থেকেই চাকরিপ্রার্থী নয়, সম্ভাব্য কর্মসংস্থান-স্রষ্টা হিসেবে প্রস্তুত করা।

সিএসআরের নতুন সংজ্ঞা

অনেক প্রতিষ্ঠান করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তা প্রায়ই সীমাবদ্ধ থাকে আনুষ্ঠানিকতা বা প্রচারণায়। কিন্তু ড্যাফোডিল গ্রুপ তাদের ‘One-Third Social Commitment’ নীতির মাধ্যমে একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে—আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগ।

তাদের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে:

শিক্ষা সম্প্রসারণ: দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ
ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ
স্বাস্থ্যসেবা: কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্য উদ্যোগ
দক্ষতা উন্নয়ন: আইটি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি

‘জীবিকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং গবেষণাভিত্তিক সামাজিক পরিবর্তনের উদ্যোগ—এসব মিলিয়ে এটি করপোরেট জগতে একটি কার্যকর সামাজিক বিনিয়োগ মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

প্রযুক্তি ও বিকাশমান মানসিকতা

ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল অটোমেশন ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। অনলাইন আবেদন, যাচাই-বাছাই, সাক্ষাৎকার ও ডেটা ব্যবস্থাপনা—সবই স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।

শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘Growth Mindset’ বা বিকাশমান মানসিকতা তৈরি করাও এই মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে শিক্ষার্থীরা প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে শেখে, সমস্যা সমাধানে দক্ষতা অর্জন করে এবং চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস পায়।

বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান

দেশের শিল্পপতি ও বিত্তবানদের জন্য এখন সময়ের প্রশ্ন—আমরা কি কেবল তাৎক্ষণিক দানে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি মেধায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করব? একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করা।

মো. সবুর খান, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, বলেন, “দান নয়, মেধায় বিনিয়োগ—এটাই হোক বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দর্শন। আমাদের লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; একটি দক্ষ, স্বনির্ভর ও উদ্যোক্তা প্রজন্ম গড়ে তোলা।”

বাংলাদেশের উন্নয়নের আগামী অধ্যায় নির্ভর করবে তারুণ্যের সঠিক বিকাশের ওপর। ‘ড্যাফোডিল মডেল’ দেখাচ্ছে—যদি দানকে রূপান্তর করা যায় বিনিয়োগে, আর সহানুভূতিকে রূপ দেওয়া যায় অংশীদারিত্বে, তবে একজন শিক্ষার্থীর গল্প বদলে দিতে পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স