ঢাকা

‘ইচ্ছেমতো’ বরখাস্তের বিধান থাকছে বিএনপি সরকারের আমলেও

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থে’ অপসারণের সুযোগ রেখে দেওয়া হচ্ছে—এমন বিধান বহাল রাখার পথে হাঁটছে বিএনপি সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্পষ্ট সংজ্ঞার এই ধারা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করবে এবং কার্যত ‘ইচ্ছেমতো বরখাস্তের’ সুযোগ দেবে। তাদের মতে, এটি স্থানীয় সরকারকে স্বশাসিত ও ক্ষমতাবান করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ থেকে বর্তমান অবস্থান

২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ মোকাবিলার যুক্তিতে চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করে। ১৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জারি হওয়া—

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪
জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪
উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪

এসব অধ্যাদেশে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থে’ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি সরকারের হাতে দেওয়া হয়। তবে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থ’—এই দুই শব্দের কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি।

আইন সংশোধনের দুই দিনের মাথায়, ১৯ আগস্ট ২০২৪, ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র, ৬০টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং দেশের সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করা হয়। পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৮৭৬ জন জনপ্রতিনিধিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।

সংসদীয় পর্যালোচনা ও বিএনপির সিদ্ধান্ত

বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ১১৭টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি আপাতত বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে—অর্থাৎ সেগুলো কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে।

তবে স্থানীয় সরকার–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ ও ‘জনস্বার্থ’ ভিত্তিক বরখাস্তের বিধান আইন আকারে পাস হওয়ার পথে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, অধ্যাদেশগুলো সংসদের বিশেষ কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে আইন আকারে উত্থাপনের জন্য অনুমোদিত হয়েছে এবং দ্রুত সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

বরখাস্তের ধারা ‘অগণতান্ত্রিক’—এমন সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বরখাস্ত যদি আইনসিদ্ধ হয়, তাহলে আমরা বরখাস্ত করব। আর যদি আইন পরিপন্থী হয়, সে ক্ষেত্রে যাঁকে বরখাস্ত করা হবে, তিনি আদালতে যেতে পারবেন।”

আইনে আগে কী ছিল

সংশোধনের আগে স্থানীয় সরকার আইনে অপসারণের নির্দিষ্ট শর্ত ছিল। যেমন—

যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া টানা তিনটি সভায় অনুপস্থিতি
রাষ্ট্র বা পরিষদের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা
নৈতিক স্খলনের অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হওয়া
দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি বা অক্ষমতা
অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হওয়া
নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব না দেওয়া বা মিথ্যা তথ্য প্রদান

এ ছাড়া অনাস্থা প্রস্তাব ও নির্দিষ্ট তদন্ত–প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণের বিধান ছিল। অর্থাৎ অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক, শর্তসাপেক্ষ এবং বিচারিক পর্যালোচনার আওতায়।

বর্তমান অধ্যাদেশে আইনের অন্যান্য ধারার ওপর প্রাধান্য দিয়ে নির্বাহী আদেশে সরাসরি অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়।

স্থানীয় সরকার ও আমলানির্ভরতা

বাংলাদেশে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার রয়েছে—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন। বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ (পার্বত্য তিন জেলা বাদে), ৩৩০টি পৌরসভা ও ১২টি সিটি করপোরেশন রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অপসারিত জনপ্রতিনিধিদের স্থলে অতিরিক্ত সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ইউএনওসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপি সরকার গঠনের পর ইতিমধ্যে ৫৬টি জেলা পরিষদ এবং রাজধানীর দুইটিসহ ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ তুলেছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। তারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়।

বিশেষজ্ঞদের মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের ‘ইচ্ছেমতো’ সুযোগ রাখা দুঃখজনক। কোনো সরকারই স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত অর্থে স্বশাসিত করতে চায়নি; বরং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস এম মাহিদুল ইসলাম বলেন, কারণ দর্শানোর নোটিশ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়া সরাসরি অপসারণের বিধান সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এতে আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইশতেহার বনাম বাস্তবতা

বিএনপির ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা’র ৩১ দফার ২১ নম্বর দফায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বশাসিত ও ক্ষমতাবান করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে মৃত্যু বা আদালতের আদেশ ছাড়া প্রশাসক নিয়োগ না করা এবং আদালতের রায় ছাড়া নির্বাহী আদেশে বরখাস্ত না করার প্রতিশ্রুতি ছিল।

সমালোচকদের মতে, বর্তমান অবস্থান সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্থানীয় সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়লে বিকেন্দ্রীকরণ ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইনগত প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা প্রয়োজন, কিন্তু অস্পষ্ট ও বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স