সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল–সহ সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের রাজপথে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কার কার্যক্রম ঝুলে পড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পথে; এই প্রেক্ষাপটে যারা এসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাদের প্রকাশ্যে অবস্থান জানানো উচিত।
শনিবার (৫ এপ্রিল) পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
‘অর্জন ধরে রাখতে হলে মাঠে নামতে হবে’
নাহিদ ইসলাম বলেন, “মানুষের রক্তের ওপর দিয়ে আমরা তাঁদের ক্ষমতা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যতটুকু অর্জন হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলেও তাঁদের মাঠে নামতে হবে।”
তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বর্তমান সরকার সংসদে উত্থাপন করছে না। ফলে সেগুলো আইনে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে নির্বাহী বিভাগের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বজায় রাখার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
বিএনপির বিরুদ্ধে ‘গণরায় উপেক্ষার’ অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার পর বিএনপি কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করছে না। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে পাওয়া গণরায় তারা মানছে না এবং নতুন নতুন অজুহাত তুলে প্রস্তাবনা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “যে অধ্যাদেশগুলো জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে করা হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে। অথচ যারা এসব অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিলেন, তারা নীরব থাকবেন—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
নাহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক ইউনূস ও আসিফ নজরুলসহ সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের এখন প্রকাশ্যে এসে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা উচিত। “ড. ইউনূসকে মুখ খুলতে হবে,”—যোগ করেন তিনি।
‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ অভিযোগ
এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, একটি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ক্ষমতা বিএনপির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এখন যদি সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজ নিজ পেশাগত জীবনে ফিরে যান, তবে জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
তিনি বলেন, “জনগণের কাঠগড়ায় তাদেরও দাঁড়াতে হবে।”
সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
জাতীয় সংসদের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা চললেও প্রকৃত সংস্কার-আলোচনার পরিবেশ নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংসদকে অকার্যকর করছে সরকারি দলই। তাঁর বক্তব্য, জাতীয় নির্বাচনের ভিত্তিতে গঠিত সংসদ কার্যকর থাকলেও গণভোটের মাধ্যমে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল, সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সংসদের কার্যকারিতা আংশিকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
“দুটি নির্বাচন হয়েছে—জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। জাতীয় নির্বাচনের ভিত্তিতে সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু গণভোটের ফল অনুযায়ী যে সংস্কার প্রক্রিয়া এগোনোর কথা ছিল, তা স্থবির হয়ে আছে,”—বলেন তিনি।
রাজনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিত
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে স্পষ্ট, সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকার গণভোটের ফলাফল ও অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে অনাগ্রহী—এমন অভিযোগ তুলছে বিরোধীপক্ষ; অন্যদিকে সরকারপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
সংস্কার বাস্তবায়ন, নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণভোটের ফলাফলের কার্যকারিতা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের ইঙ্গিত মিলছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, এখন তা দেখার বিষয়।