ঢাকা

বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আপত্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিল চায় গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ বাতিলের দাবি জানিয়েছে বামধারার রাজনৈতিক জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। চুক্তিটিকে তারা বৈষম্যমূলক, অস্বচ্ছ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে অভিযুক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অবিলম্বে অপসারণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে জোটটি।

সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব-এর সামনে আয়োজিত সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে এসব দাবি উত্থাপন করেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতারা। তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত এই চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে এবং বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থানকে দুর্বল করবে। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বানও জানান তারা।

‘সমতা নয়, একতরফা সুবিধা’

সমাবেশে বক্তব্য দেন বজলুর রশীদ ফিরোজ, যিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির মূল নীতি হওয়া উচিত দুই দেশের মধ্যে সমতা ও পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত এ চুক্তি সেই নীতির পরিপন্থী।

তার অভিযোগ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অতি গোপনে ও তড়িঘড়ি করে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। তিনি বলেন, “এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় প্রণীত, বাংলাদেশের নয়।”

শুল্ক ছাড় ও রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা

বজলুর রশীদ ফিরোজ দাবি করেন, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ শুল্কসুবিধা পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি-শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল, তা ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে—যা বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা নয়। “নামমাত্র ছাড়ের বিনিময়ে আমরা বিপুল শুল্ক রাজস্ব হারাতে যাচ্ছি,”—মন্তব্য করেন তিনি।

‘বাজার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ অভিযোগ

সমাবেশে নেতারা অভিযোগ করেন, চুক্তির ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সস্তায় পণ্য আমদানির স্বাধীনতা হারাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট পণ্য তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে বাধ্য হবে। গম, তুলা, রাসায়নিক ও শিল্পপণ্য, এলএনজি এবং প্রতিরক্ষাসামগ্রীসহ বিভিন্ন খাতে এ প্রভাব পড়তে পারে বলে দাবি করা হয়।

বজলুর রশীদ ফিরোজ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Boeing-এর কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার পৃথক একটি চুক্তিও সই হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, চুক্তির প্রাথমিক মূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। এ অর্থ ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

তিনি অভিযোগ করেন, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এ ধরনের উচ্চমূল্যের রাষ্ট্রীয় ক্রয়চুক্তি করা বিদ্যমান ক্রয়নীতির পরিপন্থী এবং এতে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বিভিন্ন বাম দলের সমর্থন

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সাজ্জাদ জহির, যিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সভাপতি। উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ (মাহবুব), বাসদ (মার্ক্সবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদসহ বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।

তারা সম্মিলিতভাবে চুক্তি বাতিল, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি এবং জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা আয়োজনের দাবি জানান।

সরকারের প্রতিক্রিয়া অনুল্লিখিত

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চুক্তি নিয়ে সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের চুক্তি বাস্তবায়নের আগে সংসদীয় পর্যালোচনা ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ জরুরি, যাতে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি না হয়।

চুক্তিটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র আকার নিলে তা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স