ঢাকা

রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানাল সরকারি দল, কারণ জানতে চায় বিরোধী শিবির

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। সরকারি দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ও দিকনির্দেশনার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানালেও বিরোধী দলের সদস্যরা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন—যে রাষ্ট্রপতি অতীতের নানা অন্যায়ের প্রশ্নে নীরব ছিলেন, তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়?

বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এ আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের মোট ১৬ জন সদস্য অংশ নেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল–এর সভাপতিত্বে অধিবেশনের এ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

সরকারি দলের বক্তব্য: ‘নতুন বাংলাদেশের পথচলায় রাষ্ট্রপতির দিকনির্দেশনা’

সরকারদলীয় সদস্যরা বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংস্কার প্রক্রিয়া ও উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি রূপরেখা উঠে এসেছে। তাঁরা মনে করেন, চলমান পরিবর্তনের সময়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

ঢাকা-১৮ আসনের সরকারদলীয় সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অতীতের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। তিনি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করে বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আছে এবং নেতৃত্ব সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে।

নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে সিটি করপোরেশনে যুক্ত হওয়া নতুন ১২টি ওয়ার্ডে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। তিনি আবদুল্লাহপুর বেড়িবাঁধকে ৩০০ ফিট সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন, যাতে যানজট নিরসন সম্ভব হয়।

নেত্রকোনা-2 আসনের সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম বিরোধী দলের সমালোচনা করে বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণের দিন জাতীয় সংগীতের প্রতি বিরোধী দলের আচরণ দুঃখজনক। শপথ নেওয়ার পর ভাষণের সময় ওয়াকআউটকে তিনি ‘দ্বিচারিতা’ বলে আখ্যা দেন।

বিরোধীদের কড়া সমালোচনা: ‘নীরব রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ কেন?’

অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চট্টগ্রাম-১৬ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য জহিরুল ইসলাম বলেন, একজন রাষ্ট্রপতির দৃঢ় নীতি ও স্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক জীবনে সে ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। “ফ্যাসিস্ট শাসনের সময়ে নীরবতা এবং পরবর্তী সময়ে ভিন্ন অবস্থান—এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়া যায় না,”—বলেন তিনি।

নীলফামারী-২ আসনের জামায়াতের সদস্য আল ফারুক আবদুল লতিফ আরও কঠোর ভাষায় বলেন, অতীতের গুম-খুন ও অন্যায়ের প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি কার্যকর ভূমিকা নেননি। ফলে তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপি সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সংস্কার ইস্যুতে ঐকমত্য হলেও বাস্তবায়নে সরকারি দলের অনীহা দেখা যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকেও দলীয়করণ চলছে।

উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগের প্রসঙ্গ

আলোচনায় অংশ নেওয়া একাধিক সদস্য তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় তুলে ধরেন। স্পিকারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান তাঁরা।

এদিন আলোচনায় আরও অংশ নেন—
সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের আইনুল হক, হবিগঞ্জ-২ আসনের আবু মনসুর সাখাওয়াত হোসেন, শরীয়তপুর-২ আসনের শফিকুর রহমান (কিরণ), কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মাজহারুল ইসলাম, কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, জামালপুর-৫ আসনের শাহ মো. ওয়ারেস আলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের খালেদ হোসেন, গাজীপুর-১ আসনের মুজিবুর রহমান এবং শেরপুর-১ আসনের রাশেদুল ইসলাম রাশেদ।

রাজনৈতিক বার্তা

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা ঘিরে সংসদে যে বিভাজন দেখা গেল, তা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সরকারি দল যেখানে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিরোধীরা অতীত ভূমিকার সমালোচনা সামনে এনে নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা আরও কয়েক দিন চলতে পারে বলে সংসদ সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের নীতি-অবস্থান ও বিরোধী দলের আপত্তির বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স