ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর পরও ভোগান্তি কমেনি। রোববার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে গ্রাহকদের। অনেকের প্রশ্ন—দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ কি স্বাভাবিক হবে?
জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোকে অকটেন ২০ শতাংশ এবং পেট্রল ও ডিজেল ১০ শতাংশ বেশি সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সোমবার থেকে ফিলিং স্টেশনগুলো অতিরিক্ত তেল পাওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং দাম বাড়তে শুরু করে। মার্চ মাসে সরকার দাম না বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার–২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও সরকার এত দিন জনস্বার্থে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে।
সাধারণত প্রতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়। তবে মাস শেষ হওয়ার আগেই গত শনিবার দিবাগত রাতে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। এতে ডিজেল লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে সমন্বয় ছাড়া উপায় ছিল না। বাড়তি দামে আমদানি করে যে মজুত গড়া হয়েছে, তার চাপ কিছুটা সামাল দিতেই এ সিদ্ধান্ত।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার এক দফায় জ্বালানির দাম লিটারে ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়েছিল, যার প্রভাব পড়ে বাজারদরে।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আমদানি ও বিক্রয় পর্যায়ে বিভিন্ন শুল্ক ও কর থেকে বছরে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসে। বিপিসি ও তার তিন সহযোগী প্রতিষ্ঠান—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—ডিলারের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করে থাকে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত এক দশকে নয় বছরই লাভ করেছে সংস্থাটি; শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসেও বিপিসি এক হাজার কোটির বেশি মুনাফা করেছে বলে জানা গেছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে মার্চে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এপ্রিলেও লোকসান বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন দামে মাসে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হতে পারে, যার বড় অংশ আসবে ডিজেল থেকে।
মজুত পরিস্থিতি
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন। আগামী দুই সপ্তাহে আরও ৪ লাখ ৭৮ হাজার টন ডিজেল যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি জাহাজে এক লাখ টনের বেশি ডিজেল ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে।
গত বছর তুলনায় মার্চে ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৬ শতাংশ কমানো হয়েছিল। এখন সেই ঘাটতি কাটাতে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, পেট্রলপাম্প থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি চাহিদা আসছে। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় নতুন করে দৈনিক বরাদ্দ নির্ধারণ করা হবে।
অকটেনের ক্ষেত্রে ঘাটতি নেই বলে দাবি করা হয়েছে। মজুত সক্ষমতা ৪৫ হাজার ৮১৯ টন, আর ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মজুত ছিল ২৯ হাজার ৪৮৪ টন। চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫ হাজার টন অকটেনবাহী একটি জাহাজ এসেছে। দেশীয় উৎস থেকেও নিয়মিত উৎপাদন চলছে। এখন অকটেন সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।
পেট্রলের বর্তমান মজুত ১৮ হাজার ৮৩০ টন, যা সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদন। মার্চে সরবরাহ ১৫ শতাংশ এবং এপ্রিলে প্রায় ৯ শতাংশ কমানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সরবরাহ বাড়ানো হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দাম বাড়ানো সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তার মতে, দাম বাড়ালেই জ্বালানির প্রাপ্যতা বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই; তবে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমবে।