মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত অবসানে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় ফেরাতে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হলেও হরমুজ প্রণালি ও অবরোধ ইস্যুতে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল–জাজিরা।
ইসলামাবাদে নতুন বৈঠকের সম্ভাবনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংলাপ শিগগিরই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনাটি চলতি সপ্তাহান্তে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল। ইরানি বন্দরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ ঘোষণা করায় কূটনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতা
বর্তমান ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান। এর আগে ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হলেও তা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
এরপরও পাকিস্তান আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছেন।
আসিম মুনিরের তেহরান সফর
সাম্প্রতিক সময়ে সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেন এবং সেখানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং সামরিক কমান্ডের সঙ্গে আলোচনা করেন।
সফর শেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, এই সফর প্রমাণ করেছে পাকিস্তান আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে বিশ্বাসী এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ট্রাম্প মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, তিনি “দারুণ কাজ” করছেন।
শাহবাজ শরিফের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্ক সফর করেন। তার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন সংকট
সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। ইরান একদিন এটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও পরদিনই আবার বন্ধ করে দেয়।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর ও জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার না করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক মাইকেল সুব্রিজ বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ হওয়া শান্তি আলোচনার জন্য বড় ধাক্কা। তার মতে, যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো বাস্তবায়ন না হলে স্থায়ী সমাধান কঠিন হবে।
বিশ্লেষণ: শান্তি নাকি নতুন সংঘাত?
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে চলছে কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনা ও অবরোধ। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনও বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা বৈঠক সফল হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে, তবে সামুদ্রিক অবরোধ ও হরমুজ প্রণালি সংকট সমাধান না হলে সংঘাত ফের বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার একটি জানালা খুললেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। হরমুজ প্রণালি, সামরিক অবরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।