জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সরকারকে কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, সাত মাসের মধ্যে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সরকারের ব্যর্থতারই প্রকাশ। সরকার এভাবে চললে আগামী পাঁচ বছর কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াত এ কর্মসূচির আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সাত মাসের মধ্যে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। পেট্রল, ডিজেল, অকটেন ও কেরোসিন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্যেও এর প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকার লোকসান ও ভর্তুকির চাপের কথা বলছে। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, রাষ্ট্রের কোনো খাতে লোকসান হলে তা সামাল দেওয়া সরকারের দায়িত্বের অংশ কি না। জনগণের করের অর্থ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় উল্লেখ করে তিনি জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জনগণের কর ও রাজস্বের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপানো হচ্ছে। তিনি জ্বালানি তেলের বাড়ানো দাম অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সরকারের বিরুদ্ধে আরও যেসব অভিযোগ
সমাবেশে সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও করেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর ভাষায়, সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যেসব সিদ্ধান্তকে নিরাপদ মনে করছে, সেগুলোই নিচ্ছে। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘ফ্যাসিবাদ’ ও ‘কর্তৃত্ববাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণভোটের রায় বাতিল করার চেষ্টা করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না। এ বিষয়ে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে ফয়সালা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সরকার ‘দখলদারি ও নৈরাজ্যের’ পথ থেকে সরে না এলে গ্রাম, শহর, নগর ও বন্দর থেকে রাজধানীমুখী লংমার্চের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। এর আগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে জামায়াত রাজধানীতে একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।
সরকারের ভেতরে ‘অশুভ চক্রের’ অভিযোগ
সমাবেশে সরকারের ভেতরে থাকা একটি ‘অশুভ চক্র’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তবে তাঁর এই অভিযোগের পক্ষে তিনি সমাবেশে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করছে। অতীতে যারা জামায়াতকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে, তারা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে—এমন দাবিও করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুরও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর বক্তব্যে টুকুর অতীত দায়িত্ব পালনের সমালোচনা এবং বর্তমান সরকারের জ্বালানি নীতির সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করে বিভিন্ন মন্তব্য উঠে আসে।
রফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্য
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানও সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সাত মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষের ওপর ভোগান্তির বোঝা বেড়েছে।
তাঁর অভিযোগ, সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে পড়েছে এবং জনগণের সমর্থন হারিয়েছে। এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রশাসনকে ব্যবহার করে দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সমাবেশে তিনি আরও বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লেও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে তিনি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।
উত্তরেও জামায়াতের বিক্ষোভ
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। মহাখালীর কলেরা হাসপাতালের সামনে মিছিল-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার গভীর রাতে প্রেস নোট জারি করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। তাঁর দাবি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পড়বে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে সংকট নিরসনে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এতে সাড়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় জোট ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ শুরু করেছিল, যা পরে আট দফায় পরিণত হয়েছে। সরকারের ‘বাড়াবাড়ি, অজ্ঞতা ও অসহযোগিতার’ কারণে এসব দাবি যাতে আরও কঠোর আন্দোলনের দিকে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম। সঞ্চালনা করেন মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম। এতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি আবু সাদিক কায়েমসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিজয়নগর পর্যন্ত যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে সাত মাসে তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি
জামায়াতের এই প্রতিবাদ কর্মসূচির পটভূমিতে রয়েছে সরকারের সর্বশেষ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নতুন দরে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর এটি ছিল জ্বালানি তেলের তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি; এর আগে এপ্রিল ও জুনেও দাম বাড়ানো হয়েছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ঘাটতি প্রায় ১৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।