দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো নিরক্ষর। শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ।
সাক্ষরতার এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পালিত হবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এ বছর আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা।’
দিবসটি সামনে রেখে সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের সাক্ষরতার বর্তমান পরিস্থিতি, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
এখনো নিরক্ষর ২২ শতাংশের বেশি মানুষ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এর বিপরীতে এখনো ২২ শতাংশের বেশি মানুষ সাক্ষরতার আওতার বাইরে রয়েছেন।
সাক্ষরতার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই শিক্ষা থেকে বিভিন্ন কারণে বঞ্চিত। এর মধ্যে বিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়া শিশু, পড়াশোনা শুরু করেও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর এবং আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষও রয়েছেন।
শুধু পড়তে ও লিখতে পারার সক্ষমতার মধ্যেই সাক্ষরতার বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান সময়ে দৈনন্দিন জীবন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কার্যকরভাবে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া তরুণদের সাক্ষরতার পাশাপাশি কর্মমুখী দক্ষতা দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
৫৮ জেলায় চলছে কার্যকর সাক্ষরতা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের ৫৮টি জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক্-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে প্রতি জেলার ঝরে পড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম ধাপে ৪ হাজার ৪৪০ জন তরুণ-তরুণী এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া তরুণদের আবারও শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা এবং একই সঙ্গে তাঁদের কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করা। অর্থাৎ, শুধু মৌলিক সাক্ষরতা অর্জন নয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ
সরকারের এই বিশেষ কার্যক্রমে প্রতিটি কোর্সে মোট ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত।
এই কাঠামোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের একদিকে প্রয়োজনীয় সাক্ষরতা ও মৌলিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য ব্যবহারিক দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, এই কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষা থেকে কর্মে উত্তরণের সুযোগ সৃষ্টি করা। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ শেষে একজন তরুণ যেন শুধু একটি সনদ নিয়ে বের না হন, বরং অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন—সেদিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সংযোগ
সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন দক্ষ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
প্রশিক্ষণ শেষ করা এসব শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। উত্তীর্ণ দক্ষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন কোনো না কোনো ধরনের চাকরির সংযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০৩ জন সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, কার্যক্রমটির লক্ষ্য শুধু সাক্ষরতার হার বাড়ানো নয়; বরং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া তরুণদের দক্ষ করে তাঁদের শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের জন্য এ ধরনের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবনে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা
দেশের যে জনগোষ্ঠী প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, তাদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এর মাধ্যমে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত তরুণ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার সুযোগের আওতায় আনার পাশাপাশি তাঁদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় সাক্ষরতার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব তরুণ কোনো কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়েছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ কর্মসংস্থানের পথও তৈরি করতে পারে।
‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়নে সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং যারা এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাঁদের শিক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগকে জোরদার করা।
বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’—এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সাক্ষরতার সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছালেও এখনো বড় একটি জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও দক্ষতার বাইরে রয়েছে। ফলে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কার্যকর শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার আওতায় আনা আগামী দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের ৫৮ জেলার কার্যক্রম এবং ভবিষ্যতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে যারা ছিলেন
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহার এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনোয়ারা ইশরাত উপস্থিত ছিলেন।
দিবসটি সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে সাক্ষরতার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।
সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৮ শতাংশে পৌঁছালেও এখনো পাঁচজনের মধ্যে প্রায় একজন মানুষ কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার বাইরে রয়েছেন। ফলে শুধু সাক্ষরতার হার বাড়ানো নয়, শিক্ষা থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে কার্যকর সাক্ষরতা, ব্যবহারিক দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করাই আগামী দিনের বড় লক্ষ্য হয়ে উঠছে।